কলকাতা, নিউজ ডেস্ক: কত মানুষ, কত ঘর, কত পরিবার—জনগণনা বললেই এত দিন মূলত এই হিসাবের কথাই মনে এসেছে। এ বার সেই হিসাবের সঙ্গে যোগ হতে চলেছে আরও একটি প্রশ্ন, যার উত্তর ঘিরে ভবিষ্যতের রাজনীতি থেকে সংরক্ষণনীতি, সরকারি পরিকল্পনা থেকে সামাজিক সমীকরণ—সবই নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। ২০২৭-এর জনগণনায় দেশের প্রতিটি মানুষের জাতিগত পরিচয় নথিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর সেই কাজের জন্য নির্ধারিত ৪০টি প্রশ্নের মধ্যে ১০ নম্বর প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
কারণ প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সরল হলেও তার উত্তর সংগ্রহ এবং পরে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন—‘Scheduled Caste (SC)/Scheduled Tribe (ST)/Caste’। এসসি বা এসটি হলে সেই পরিচয় নথিভুক্ত হবে। আর অন্যদের ক্ষেত্রে জাতির নাম জানাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল, জাতির নাম জানানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তালিকা থেকে একটি কোড বেছে নেওয়ার বদলে উত্তরদাতা নিজের জাতির নাম বলবেন। সেই নামই নথিভুক্ত হবে। এখানেই উঠছে বিতর্ক।
একই জাতির একাধিক নাম, বানান বা আঞ্চলিক পরিচয় থাকলে কী হবে? কোনও ব্যক্তি জাতির বদলে উপ-জাতি বা স্থানীয় পরিচয় লিখলে সেটি কী ভাবে মূল জাতির সঙ্গে যুক্ত করা হবে? পদবি বা গোত্রকে কেউ জাতি হিসাবে উল্লেখ করলে সেই তথ্য কী ভাবে আলাদা করা হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন প্রশাসনের সামনে বড় পরীক্ষা।
কারণ জনগণনায় শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই কাজ শেষ নয়। সেই তথ্য পরে শ্রেণিবদ্ধ করে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরি করতে হবে। আর সেই পরিসংখ্যানের উপর ভবিষ্যতে গবেষণা, সরকারি নীতি, সামাজিক প্রকল্প এবং সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিতর্কের আরও একটি কারণ, ফর্মে আলাদা করে ‘OBC’ বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির কোনও ঘর নেই। জাতের নাম লিখে নেওয়ার পরে সেই নামগুলি বিশ্লেষণ করে কোনটি ওবিসি, কোনটি অন্য শ্রেণি—তা নির্ধারণ করতে হবে। বিরোধীদের বক্তব্য, এই পদ্ধতিতে পরে তথ্য একত্রিত করার সময় সমস্যা হতে পারে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিয়ে এই পদ্ধতি বদলে পূর্বনির্ধারিত তালিকা ও নির্দিষ্ট কোড ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন।
এই আশঙ্কার পিছনে রয়েছে ২০১১ সালের অভিজ্ঞতা। সে বার Socio-Economic and Caste Census বা SECC-এর মাধ্যমে জাতিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই তথ্যকে চূড়ান্ত ভাবে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি হয়। বিভিন্ন নাম, উপ-জাতি, স্থানীয় পরিচয় এবং বানানের কারণে বিপুল সংখ্যক আলাদা এন্ট্রি তৈরি হয়েছিল। ফলে কোন নাম কোন বৃহত্তর জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তা নির্ভুল ভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বার তাই প্রশ্ন উঠছে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা নেওয়া হল? বিহার এবং তেলঙ্গানার জাতি সমীক্ষার মডেল দেখিয়ে বিরোধীদের একাংশ বলছেন, নির্দিষ্ট তালিকা ও কোড ব্যবহার করলে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিহারে নির্দিষ্ট সংখ্যক জাতির জন্য কোড রাখা হয়েছিল। তেলঙ্গানাতেও সামাজিক গোষ্ঠী এবং জাতির তালিকা ব্যবহার করা হয়। উত্তরদাতা নিজের পরিচয় জানালেও গণনাকারী সেটিকে নির্দিষ্ট তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নথিভুক্ত করতে পারেন। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন—সারা দেশের জন্য সেই তালিকা তৈরি করবে কে?
ভারতের প্রতিটি রাজ্যে জাতিগত পরিচয়ের সামাজিক ও প্রশাসনিক সংজ্ঞা এক নয়। যে সম্প্রদায় এক রাজ্যে ওবিসি, অন্য রাজ্যে তা নাও হতে পারে। আবার একই সম্প্রদায়ের নামও অঞ্চলভেদে বদলে যেতে পারে। ফলে একটি সর্বভারতীয় তালিকা তৈরি করা নিজেই বড় প্রশাসনিক কাজ। আর এই জায়গাতেই পশ্চিমবঙ্গের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলায় ওবিসি তালিকা, জাতিগত শংসাপত্র এবং সংরক্ষণ নিয়ে গত কয়েক বছরে একাধিক বিতর্ক হয়েছে।
কোন সম্প্রদায় অনগ্রসর শ্রেণির তালিকায় থাকবে, কী ভাবে সেই তালিকা তৈরি হবে এবং সংরক্ষণের সুবিধা কারা পাবেন—এই প্রশ্নে রাজনীতি ও আদালত, দু’জায়গাতেই টানাপড়েন হয়েছে। তার মধ্যে ২০২৭-এর জনগণনায় প্রথম বার দেশজুড়ে জাতিগত পরিচয়ের তথ্য সংগ্রহ হলে বাংলার সামাজিক কাঠামোর একটি নতুন পরিসংখ্যান সামনে আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
সেই পরিসংখ্যান থেকে জানা যেতে পারে—রাজ্যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা কত, কোন অঞ্চলে কোন সম্প্রদায়ের ঘনত্ব বেশি, এসসি-এসটি ও অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠীর অনুপাত কী। পরবর্তী সময়ে সেই তথ্য সংরক্ষণ বা সরকারি কল্যাণমূলক নীতি নিয়ে আলোচনায় ব্যবহার হতে পারে। তবে জনগণনার তথ্য প্রকাশ হলেই যে সংরক্ষণের হার সরাসরি বদলে যাবে, এমন নয়। সংরক্ষণ নির্ধারণে সাংবিধানিক বিধান, আইন এবং আদালতের নির্দেশ-সহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
তবে রাজনৈতিক অভিঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এত দিন জাতিগত জনসংখ্যার যে হিসাব নিয়ে রাজনীতি হয়েছে, তার বড় অংশই ছিল পুরনো জনগণনা, বিভিন্ন সমীক্ষা বা আনুমানিক তথ্যের উপর নির্ভরশীল। ২০২৭-এর জনগণনা যদি নির্ভুল ভাবে জাতিগত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, তা হলে প্রথম বার দেশের হাতে একটি তুলনামূলক ভাবে সাম্প্রতিক ও বৃহৎ সরকারি তথ্যভান্ডার আসবে। সেই কারণেই ১০ নম্বর প্রশ্নটি নিছক একটি ঘর নয়। এটি ভবিষ্যতের ‘সামাজিক অঙ্ক’-এর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের৷
প্রশ্ন আরও আছে। জাতির তথ্য কি ব্যক্তিগত তথ্য হিসাবে কতটা সুরক্ষিত থাকবে? জনগণনা আইনের অধীনে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার ব্যবস্থা রয়েছে বলে কেন্দ্র জানিয়েছে। পুরো জনগণনা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হওয়ায় তথ্য সংগ্রহ থেকে সংরক্ষণ—প্রতিটি ধাপেই প্রযুক্তির ব্যবহার হবে।
তবে প্রযুক্তি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, তথ্যের সামাজিক অর্থ নির্ধারণ করতে পারে না। একজন মানুষ যে নামে নিজের জাতির পরিচয় দিলেন, সেটি প্রশাসনিক ভাবে কোন শ্রেণিতে পড়বে—সেখানেই শেষ পর্যন্ত নির্ভুলতার পরীক্ষা।
ফলে ২০২৭-এর জনগণনায় আসল লড়াই শুধু মানুষ গোনা নয়। মানুষের দেওয়া পরিচয়কে সঠিক ভাবে গোনা, সাজানো এবং তার অর্থ বার করা।
বাংলার জন্যও অপেক্ষা তাই শুধু মোট জনসংখ্যার নতুন হিসাবের নয়। অপেক্ষা—কত মানুষ কোন সামাজিক পরিচয়ের, সেই অঙ্ক প্রকাশ্যে এলে রাজ্যের সংরক্ষণ, রাজনীতি এবং সামাজিক সমীকরণের ছবিতে কতটা বদল আসে। ৪০টি প্রশ্নের মধ্যে সেই কারণেই ১০ নম্বরটি আপাত ছোট হলেও তার অভিঘাত হতে পারে সবচেয়ে বড়।




