নয়াদিল্লি: প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে কেন্দ্রের নতুন আইন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরপর গভীর রাতের ভিডিয়ো বার্তা এবং ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র আক্রমণ করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি নিশানা করে তাঁর অভিযোগ, ছাত্র-যুবদের কণ্ঠস্বর দমাতে ভয় দেখানো, এফআইআর দায়ের এবং সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ করা পোস্টে রাহুল লেখেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং অমিত শাহ, Gen Z-কে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যাবে না। প্রথমে তাঁদের হাড় ভেঙেছেন। এখন তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করছেন এবং তাঁদের অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দিচ্ছেন। আপনারা ভারতের অতীত। ভারতের ভবিষ্যতের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করছেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।”
অল্প সময়ের মধ্যেই সেই পোস্ট সমাজমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত বিল নিয়ে বিতর্কের পর কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান আরও আক্রমণাত্মক করারই ইঙ্গিত দিলেন রাহুল।
রাহুলের এই পোস্টের সময়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১১টার কিছু আগে ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিয়ো বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত কয়েক দিনের মধ্যে এটি ছিল তাঁর তৃতীয় গভীর রাতের বার্তা, যার মূল বিষয় ছিল দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে সরকারের অবস্থান।
ভিডিয়োয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কোটি কোটি পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেছে, সেই প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্র বা মাফিয়াদের কোনওভাবেই রেহাই দেওয়া হবে না। শুধু কঠোর আইন নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত সংশোধনী বিল ইতিমধ্যেই লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাশ হয়েছে। তাঁর দাবি, সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পড়ুয়াদের স্বার্থ রক্ষায় আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করেছে। ভবিষ্যতে যাতে কোনও অসাধু চক্র প্রশ্নপত্র ফাঁস করে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই এই আইন আনা হয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন মোদি। তাঁর বক্তব্য, বহু বছর ধরে কেন্দ্রীয় স্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। ফলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনও সমস্যা নয়। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং পরীক্ষা পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোই এখন সরকারের অগ্রাধিকার।
কিন্তু বিরোধীদের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি ছাত্র আন্দোলনের প্রতি প্রশাসনের আচরণ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। বুধবার লোকসভায় বিল নিয়ে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধি সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ছাত্রদের বিক্ষোভ দমনে ছররা বন্দুক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে।
লোকসভায় রাহুল বলেছিলেন, “আমাদের তথাকথিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এখানে এসে বসার সাহস নেই। তাঁর ৩০টি গাড়ির কনভয় রয়েছে। তিনি এখানে নেই কেন? কারণ, তিনি ভয় পেয়েছেন। ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশও তাঁর মন্ত্রক থেকেই গিয়েছিল।”
সংসদের সেই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সমাজমাধ্যমে আরও কড়া ভাষায় মোদি ও শাহ—দু'জনকেই একসঙ্গে নিশানা করলেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর অভিযোগ, ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ দমাতে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও রাহুলের এই অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর একের পর এক আশ্বাস, প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে নতুন আইন এবং বিরোধীদের পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। সংসদের ভিতরে যেমন এই বিতর্ক তীব্র হয়েছে, তেমনই সমাজমাধ্যমেও সরকার ও বিরোধীদের সংঘাত ক্রমশ আরও ধারালো হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে এবং বিরোধীদের অভিযোগ কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।