নয়াদিল্লি: সফলভাবে শেষ হল ১৮তম BRICS সম্মেলন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে বসেছিল এই আন্তর্জাতিক জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির এই মঞ্চে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জলবায়ু, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার মতো একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
BRICS-এর পরিধিও বর্তমানে অনেকটাই বেড়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি এবারের সম্মেলনে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশও অংশ নেয়। পাশাপাশি ASEAN, আফ্রিকান ইউনিয়ন, CELAC, GCC এবং BIMSTEC-এর মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের সম্মিলিত কণ্ঠ আরও জোরালো করা।
সম্মেলনে স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। MSME ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য, শক্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের মতো বিষয়ও গুরুত্ব পায়।
BRICS সম্মেলনের পাশাপাশি একাধিক রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে তাঁর বৈঠক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সূত্রের খবর, বিভিন্ন বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাত, সীমান্তে শান্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং গ্লোবাল সাউথের অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের একাধিক ক্ষেত্র পর্যালোচনা করা হয়। রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, শক্তি, মহাকাশ, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের বিষয় উঠে আসে। পশ্চিম এশিয়া এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় হয়।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার উপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংবেদনশীলতা এবং স্বার্থের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। সীমান্ত সংক্রান্ত চুক্তি ও বোঝাপড়া মেনে চলার পাশাপাশি বাণিজ্য, সাপ্লাই চেন, বাজার এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন মোদী। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃত্ব এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক ও গ্লোবাল সাউথ নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
এবারের সম্মেলনে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে মহিলাদের নেতৃত্বে উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও। ‘Women in Innovation, Science and Entrepreneurship’ বা WISE উদ্যোগের মাধ্যমে মহিলা উদ্যোক্তা ও বিজ্ঞানীদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। উদ্ভাবন, অর্থের জোগান এবং নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ—এই তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং টেলিকম পরিকাঠামো নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। ICT নিরাপত্তা, পারস্পরিকভাবে ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং সাবমেরিন কেবল পরিকাঠামোর উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি BRICS Incubator Network, প্রস্তাবিত Startup Innovation Fund এবং Digital Agriculture Network-এর মতো উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
সম্মেলনের শেষে গৃহীত New Delhi Leaders’ Declaration-এ পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাতের স্থায়ী দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে এবং গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছনোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
এবারের BRICS সম্মেলনে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, নারী নেতৃত্ব, নিরাপত্তা এবং গ্লোবাল সাউথের সম্মিলিত ভূমিকার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার দিক থেকেও সম্মেলনটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।