নয়াদিল্লি: জইশ-ই-মহম্মদ (JeM) প্রধান মাসুদ আজহারকে ঘিরে ফের মুখোমুখি ভারত ও পাকিস্তান। আজহার সম্পর্কে তথ্য দিলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা ফের সামনে আনায় পাকিস্তানকে তীব্র কটাক্ষ করল ভারত। নয়াদিল্লির বক্তব্য, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ না করে এ ধরনের ‘লোক দেখানো’ ঘোষণা করে কোনও লাভ নেই।
মঙ্গলবার বিদেশমন্ত্রকের নিয়মিত সাংবাদিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। মাসুদ আজহারের মাথার দাম ঘোষণার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পাকিস্তানের এই ধরনের ‘গিমিক’ বা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। অতীতেও একই ধরনের পদক্ষেপ দেখা গিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জয়সওয়ালের বক্তব্য, পাকিস্তান যদি সত্যিই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে চায়, তাহলে তাদের মাটিতে থাকা নিষিদ্ধ জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শুধুমাত্র পুরস্কার ঘোষণা করে দায় এড়ানোর চেষ্টা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লি।
মাসুদ আজহার ভারতের অন্যতম মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি। ভারতের অভিযোগ, ২০০১ সালের সংসদে হামলা, ২০১৬ সালের পাঠানকোট বায়ুসেনা ঘাঁটিতে হামলা এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার মতো একাধিক সন্ত্রাসবাদী ঘটনার সঙ্গে জইশ-ই-মহম্মদ এবং তার নেতৃত্বের যোগ রয়েছে।
আজহারের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কাঠমান্ডু থেকে কান্দাহারগামী IC-814 বিমান অপহরণের পর যাত্রীদের মুক্তির বিনিময়ে ভারত যে তিন জঙ্গিকে ছেড়ে দিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাসুদ আজহার। পরবর্তীতে তিনি জইশ-ই-মহম্মদের অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন।
পাকিস্তানের Federal Investigation Agency বা FIA-র ‘রেড বুক’-এও আজহারের নাম রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা জানে না আজহার বর্তমানে কোথায় রয়েছেন। ইসলামাবাদের তরফে এমন দাবিও করা হয়েছে যে, তিনি সম্ভবত আফগানিস্তানে পালিয়ে গিয়েছেন। যদিও ভারত বরাবরই অভিযোগ করে এসেছে, পাকিস্তানের মাটিতেই আজহারকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
তালিবান প্রশাসনও পাকিস্তানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আজহারের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে।
এরই মধ্যে পাকিস্তানের তরফে আজহারকে নিয়ে পুরস্কারের ঘোষণা ফের সামনে আসার বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে অর্থের জোগান এবং জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে পাকিস্তানের উপর নজর রয়েছে Financial Action Task Force বা FATF-এর।
আগামী মাসে FATF-এর পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদবিরোধী পদক্ষেপ পর্যালোচনা হওয়ার কথা। অতীতে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান FATF-এর ‘গ্রে লিস্টে’ ছিল। সেই সময়ে জইশ-ই-মহম্মদ এবং লস্কর-ই-তইবার মতো সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল।
২০১৯ সালের মে মাসে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি হিসেবে ঘোষণা করে। চিন আপত্তি প্রত্যাহার করার পরেই সেই তালিকাভুক্তি সম্ভব হয়েছিল।
ফলে নতুন করে আজহারকে ঘিরে পাকিস্তানের পুরস্কার ঘোষণা এবং তার পাল্টা ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলেও নজর কেড়েছে। নয়াদিল্লির বার্তা স্পষ্ট জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপের পরিবর্তে শুধু ঘোষণা করে পরিস্থিতি বদলানো যাবে না।




