নিউজ ডেস্ক: কম্বোডিয়ার ঘন জঙ্গলের নিচে লুকিয়ে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাক-শিল্পযুগীয় শহর, যেখানে একসময় দশ লক্ষ মানুষ বাস করত, আর তারপর হঠাৎ করে সবকিছু নীরব হয়ে গেল। কম্বোডিয়ার সিয়েম রিপ প্রদেশে, ঘন গাছপালার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল মন্দির নগরী। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আংকোর ওয়াট, পৃথিবীর বৃহত্তম ধর্মীয় স্থাপনা, যা ক্ষেত্রফলে প্রায় একশো বাষট্টি হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। কিন্তু আংকোর আসলে শুধু একটা মন্দির নয়, বরং ছিল এক বিশাল শহরের সমষ্টি, যা নবম থেকে পনেরো শতক পর্যন্ত খেমার সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল।
দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মন আংকোর ওয়াট নির্মাণ করান, মূলত হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে। এই মন্দিরের নকশা হিন্দু পুরাণের মেরু পর্বতের প্রতীক, যেখানে পাঁচটা কেন্দ্রীয় চূড়া সৃষ্টির পাঁচ শিখরকে বোঝায়। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেমার রাজারা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলে মন্দিরটা বৌদ্ধ উপাসনালয়ে রূপান্তরিত হয়, যা আজও সেভাবেই ব্যবহৃত হয়। আংকোর থম নামের আরেক বিশাল নগরীর কেন্দ্রে আছে বায়োন মন্দির, যার প্রায় পঞ্চাশটা টাওয়ারের প্রতিটায় খোদাই করা আছে বিশাল মানুষের মুখ, সবগুলো হাসিমুখে চারদিকে তাকিয়ে আছে। এই মুখগুলো কার, রাজা সপ্তম জয়বর্মনের, নাকি করুণার বৌদ্ধ দেবতা অবলোকিতেশ্বরের, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আজও বিতর্ক আছে।
আংকোরের বিশাল জনসংখ্যা টিকিয়ে রাখার পেছনে ছিল এক জটিল জল ব্যবস্থাপনা, বিশাল জলাধার, খাল, আর বাঁধ, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি দিত, আবার বর্ষায় বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণ করত। লিডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশ থেকে মাটি স্ক্যান করে গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন, শহরের জনবসতি আগে যতটা ভাবা হত তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল, যা প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। পনেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে আংকোর হঠাৎ পরিত্যক্ত হয়ে যায়, আর রাজধানী সরিয়ে নেওয়া হয় দক্ষিণে। এর কারণ নিয়ে নানা তত্ত্ব আছে। জলবায়ু গবেষণায় দেখা গেছে, চতুর্দশ আর পঞ্চদশ শতকে এই অঞ্চলে একের পর এক ভয়াবহ খরা আর তীব্র বর্ষা এসেছিল, যা বিশাল জল ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। আবার প্রতিবেশী সাম্রাজ্যের আক্রমণ আর ধর্মীয় পরিবর্তনও ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
আংকোর কখনো পুরোপুরি ভুলে যাওয়া শহর ছিল না, স্থানীয় সন্ন্যাসীরা আংকোর ওয়াটে উপাসনা চালিয়ে গেছেন। তবে ১৮৬০ সালে ফরাসি প্রকৃতিবিদ হেনরি মুহো আংকোরের ছবি আর বিবরণ ইউরোপে প্রকাশ করার পর বিশ্ব নতুন করে এই বিস্ময়কর শহরের কথা জানতে পারে।গবেষকদের মতে, আংকোরের পতন কোনো একক ঘটনার ফল নয়, বরং জলবায়ু বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল। এই বিশাল শহর হয়তো শেষ পর্যন্ত নিজের জলব্যবস্থার ভার সামলাতে পারেনি।
আংকোর মনে করিয়ে দেয়, যত বিশাল সাম্রাজ্যই হোক, প্রকৃতির পরিবর্তনের সামনে সবকিছু ভঙ্গুর। যে শহরে একসময় দশ লক্ষ মানুষ ছিল, তার পাথরের মুখেরা আজও নীরবে হেসে আছে, যেন জানে সব কথা, কিন্তু বলবে না।




