নয়াদিল্লি: কখনও সাংবাদিক, কখনও তথ্যচিত্র নির্মাতা, কখনও আবার যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে লড়াই করা যোদ্ধা। লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়াম্মর গদ্দাফির কারাগার থেকে ইউক্রেনের রণাঙ্গন—বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ঘুরে বেড়ানো এক মার্কিন নাগরিককে ঘিরে এ বার আন্তর্জাতিক মহলে চর্চা। তাঁর নাম ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যানডাইক। ২০২৬ সালের ১৩ মার্চ কলকাতা বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ। অভিযোগ ছিল, ছ’জন ইউক্রেনীয় নাগরিকের সঙ্গে মিলে তিনি মায়ানমারে নিষিদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে প্রশিক্ষণ এবং ড্রোন-সহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের কাজে যুক্ত ছিলেন।
সেই অস্ত্র ও সরঞ্জাম ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ব্যবহার করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আনা হয়। কিন্তু ছ’মাসেরও বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পরে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জামিনে মুক্তি পান ভ্যানডাইক ও তাঁর ছ’জন সহ-অভিযুক্ত। তার পর আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার অনুমতিও পান তিনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কে এই ভ্যানডাইক? কেনই বা বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতি? আর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংঘাতের যোগ কোথায়?
বাল্টিমোরের ছেলে, আগ্রহ আরব দুনিয়ায়
১৯৭৯ সালের ১১ জুন আমেরিকার মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে জন্ম ভ্যানডাইকের। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পরে মা ও দাদু-দিদার কাছে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। ২০০২ সালে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হন। পরে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিরাপত্তা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পশ্চিম এশিয়া ও আরব দুনিয়ার রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই।
এক সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-তে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। প্রথমে বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করে পরে গোপন অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে অতীতে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ভ্যানডাইক। কিন্তু ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা তাঁর সেই পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে। শেষ পর্যন্ত প্রচলিত পেশাগত জীবনের বদলে অন্য পথ বেছে নেন তিনি।
২০০৭ সালে মোটরবাইকে চেপে আরব দুনিয়া ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেন ভ্যানডাইক। উদ্দেশ্য ছিল ভ্রমণ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা। মরক্কো, মৌরিতানিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, জর্ডন, সিরিয়া-সহ উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরেন তিনি। পরে ইরাক, ইরান ও আফগানিস্তানেও যান। কিন্তু ক্রমে ভ্রমণ ও তথ্যচিত্র তৈরির গণ্ডি ছাড়িয়ে সংঘাতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
গদ্দাফির হাতে বন্দি, মুক্তি পেয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরা
২০১১ সালে লিবিয়ায় গদ্দাফি-বিরোধী আন্দোলন যখন গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে, তখন বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় ভ্যানডাইকের। ওই বছরের ১৩ মার্চ তেলসমৃদ্ধ ব্রেগা শহরের কাছে হামলার মুখে পড়ে বন্দি হন তিনি। পরে তাঁকে ত্রিপোলির কারাগারে রাখা হয়। বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, প্রথমে মাকতাব আল-নাসের এবং পরে আবু সেলিম জেলে কাটাতে হয় তাঁকে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৬৬ দিন বন্দি ছিলেন ভ্যানডাইক।
তাঁর মুক্তির দাবিতে আমেরিকায় প্রচার শুরু করেন মা শ্যারন ভ্যানডাইক এবং ঘনিষ্ঠেরা। মার্কিন কংগ্রেস সদস্যের কাছেও সাহায্য চাওয়া হয়। সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসও প্রথম দিকে তাঁকে আটক সাংবাদিকদের তালিকায় রেখেছিল।
কিন্তু ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট ত্রিপোলিতে গদ্দাফি-বিরোধী বাহিনীর অগ্রগতির মধ্যে আবু সেলিম কারাগারের রক্ষীরা পালিয়ে গেলে অন্য বন্দিদের সঙ্গে মুক্তি পান ভ্যানডাইক। আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার বদলে তিনি লিবিয়ার বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগ দেন বলে তাঁর নিজের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে। সিরতে শহরের লড়াইয়েও অংশ নেন তিনি। পরে দেশে ফেরেন।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সামনে আসার পরে তাঁকে স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে গণ্য করার অবস্থান থেকে সরে আসে কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস। সংস্থাটির বক্তব্য ছিল, সশস্ত্র সংঘাতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের সাংবাদিক হিসেবে নিহত, নিখোঁজ বা বন্দি হওয়ার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ফলে ভ্যানডাইকের পরিচয় নিয়ে প্রথম থেকেই বিতর্ক ছিল—তিনি কি সাংবাদিক, নাকি সংঘাতে সরাসরি অংশ নেওয়া এক যোদ্ধা?
সিরিয়া থেকে ইউক্রেন, যুদ্ধই যেন পেশা
লিবিয়া থেকে ফেরার পরেও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে দূরে থাকেননি ভ্যানডাইক। ২০১২ সালে সিরিয়ার আলেপ্পোয় যান। সেখানে বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিদ্রোহীদের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেন। ‘নট এনিমোর: আ স্টোরি অব রেভলিউশন’ নামে সেই ছবিতে সিরিয়ার সাংবাদিক নুর কেলজে এবং এক বিদ্রোহী কমান্ডারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়।
২০১৪ সালে তাঁর লিবিয়া-যাত্রা ও বন্দিজীবনের ফুটেজ নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘পয়েন্ট অ্যান্ড শুট’ ট্রাইবেকা চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার পায়। এর পর একই বছর ‘সন্স অব লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল’ বা সোলি নামে একটি মার্কিন অলাভজনক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সংস্থাটির দাবি, স্বৈরাচারী শাসন ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বাহিনীকে বিনামূল্যে সামরিক প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং সরঞ্জাম সরবরাহ করাই তাদের উদ্দেশ্য।
সোলির বক্তব্য, ইরাকে অ্যাসিরীয় খ্রিস্টানদের সুরক্ষায় গঠিত একটি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের কাজ শুরু হয়। পরে ফিলিপিন্সের একটি সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী বাহিনীর সঙ্গেও কাজ করে সংস্থাটি। ২০২২ সালের মার্চ থেকে ইউক্রেনের বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কাজেও যুক্ত থাকার দাবি করেছে তারা।
ভ্যানডাইক নিজেও ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীতে যোদ্ধা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সমাজমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, ২০১৯ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার বিদ্রোহীদের সঙ্গে গোপন অভিযানেও যুক্ত ছিলেন। তবে এই দাবিগুলির সব ক’টির স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সোলির সঙ্গে যুক্ত ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, ভ্যানডাইকের কাছে ‘স্বাধীনতা’ একটি রাজনৈতিক আদর্শ। তাঁদের দাবি, তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করা শক্তিগুলিকে সাহায্য করতে চান। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, অন্য দেশের সংঘাতে অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করা কোনও ব্যক্তি ঠিক কোন পরিচয়ে কাজ করছেন, তার সীমারেখা কোথায়? সেই প্রশ্নই আরও জোরালো হয়েছে ভারতের মামলাকে ঘিরে।
মায়ানমার-যোগ, এনআইএর গুরুতর অভিযোগ
২০২৬ সালের ১৩ মার্চ কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ভ্যানডাইককে গ্রেফতার করে এনআইএ। একই দিনে লখনউ ও দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ছ’জন ইউক্রেনীয় নাগরিককে আটক করা হয়। তাঁদের নাম পেত্রো হুরবা, তারাস স্লিভিয়াক, ইভান সুকমানভস্কি, মারিয়ান স্তেফানকিভ, মাকসিম হনচারুক এবং ভিক্টর কামিনস্কি।
এনআইএর অভিযোগ, সাত জন পর্যটক ভিসায় ভারতে প্রবেশ করে অসম হয়ে মিজোরামে যান। মিজোরাম থেকে তাঁরা আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে মায়ানমারে প্রবেশ করেন। সেখানে নিষিদ্ধ ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপ থেকে ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন তাঁরা বলে অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থার।
এনআইএর দাবি, মায়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে ওই সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল। তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে সংস্থাটি আরও অভিযোগ করে, মার্কিন ও ইউক্রেনীয় নাগরিকদের একটি অংশ মায়ানমারে একটি অসামরিক বিমানে ড্রোন হামলার ঘটনায় যুক্ত থাকতে পারেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ভ্যানডাইক ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএ-র ১৮ নম্বর ধারায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ—দুটি এক বিষয় নয়। মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়নি। ভ্যানডাইক ও তাঁর পরিবারের তরফে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। পরিবারের বক্তব্য, তিনি নির্দোষ এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় মানবিক সহায়তা ও গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করেছেন।
তিহাড়ে বন্দিজীবন, খাবার নিয়ে আদালতে আবেদন
গ্রেফতারের পর প্রথমে পুলিশি হেফাজতে এবং পরে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রাখা হয় ভ্যানডাইককে। ৬ এপ্রিল তাঁকে দিল্লির তিহাড় জেলে পাঠানো হয়। জেলের উচ্চ নিরাপত্তাবিশিষ্ট ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি পৃথক কক্ষে রাখা হয়েছিল তাঁকে বলে জানা গিয়েছে।
জেলে থাকার সময় খাবার নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন ভ্যানডাইক। তাঁর আবেদনে দাবি করা হয়, ভারতীয় জেলের ঝাল, তেলযুক্ত ও ভাজাভুজি খাবারে অভ্যস্ত নন তিনি। সেই কারণে নিয়মিত খাবার খেতে পারছিলেন না এবং তাঁর ওজন প্রায় ১৪ কেজি কমে গিয়েছিল। দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও দেখা দিয়েছিল বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিজের খাবার নিজে তৈরি করার জন্য রান্নার ব্যবস্থা চেয়েছিলেন তিনি। ডাল, মাংস, মাছ, ভাত, পাস্তা, আলু, পেঁয়াজ, দুধ, রুটি, মাখন, অলিভ অয়েল-সহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী এবং রান্নার সরঞ্জামের তালিকা আদালতে জমা দেন। সূত্রের দাবি, তাঁর বিশেষ খাদ্যচাহিদা মেটাতে রান্নার লোক-সহ বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
এ দিকে ভ্যানডাইকের মুক্তির দাবিতে আমেরিকায় প্রচার চালান তাঁর মা শ্যারন এবং সোলির সঙ্গে যুক্ত ঘনিষ্ঠেরা। মার্কিন দূতাবাস ও আইনপ্রণেতাদের কাছে আবেদন জানানো হয়। বন্দিজীবনে একাকী রাখা এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অভিযোগও ওঠে। তবে পরিবারের দাবি এবং জেলের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্যের সব দিক স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি।
জামিনে মুক্তি, আমেরিকায় ফেরার অনুমতি
ছ’মাসেরও বেশি সময় বন্দি থাকার পর ১৮ সেপ্টেম্বর ভ্যানডাইক ও তাঁর ছ’জন ইউক্রেনীয় সহ-অভিযুক্ত ডিফল্ট জামিন পান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তের প্রয়োজনীয় নথি বা চার্জশিট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি শর্ত পূরণ না হলে অভিযুক্তের ডিফল্ট জামিন পাওয়ার সুযোগ থাকে। ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁরা ভারত ছেড়ে নিজ নিজ দেশে চলে যান।
কিন্তু মামলায় নতুন মোড় আসে ২৩ অক্টোবর। দিল্লির আদালতে হাজির হন ভ্যানডাইক। এনআইএ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত শেষ করতে আরও তিন মাস প্রয়োজন। আদালত তাঁর আচরণ ও শর্ত মেনে চলার বিষয়টি বিবেচনা করে তাঁকে আমেরিকায় থাকার অনুমতি দেয়। ২০২৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাঁকে ভারতে ফিরে আসতে হবে।
অর্থাৎ, জামিন পাওয়া বা বিদেশে যাওয়ার অনুমতি মেলার অর্থ মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া নয়। তদন্ত এখনও চলছে এবং অভিযোগের বিচারও বাকি। ভ্যানডাইকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত আদালতেই নির্ধারিত হবে।
যোদ্ধা, মানবাধিকারকর্মী, না কি ভাড়াটে সেনা?
ভ্যানডাইকের জীবনকে একটিমাত্র পরিচয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তিনি নিজেকে স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা, তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষদের সাহায্য করতে চান। অন্য দিকে, বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র সংঘাতে তাঁর অংশগ্রহণ এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ তাঁকে ঘিরে সন্দেহও তৈরি করেছে।
তাঁকে ‘ভাড়াটে সেনা’ বা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট বলেও নানা সময়ে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সিআইএর সঙ্গে তাঁর যোগ থাকার কোনও প্রমাণ প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে এমন অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখা যায় না।
ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি আরও জটিল, কারণ অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সীমান্ত পেরিয়ে মায়ানমারে যাওয়া, সশস্ত্র গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ড্রোন-সহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের মতো বিষয়। এগুলির সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।
আবার অভিযুক্তের অধিকার, তদন্তের সময়সীমা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রশ্নও রয়েছে। লিবিয়ায় গদ্দাফির কারাগারে বন্দিজীবন থেকে তিহাড়ের হেফাজত—ভ্যানডাইকের জীবনে নাটকীয় ঘটনার অভাব নেই। কিন্তু তাঁর অতীতের অভিযান যতই আকর্ষণীয় হোক, ভারতের মামলার নিষ্পত্তি নির্ভর করবে প্রমাণ, তদন্ত এবং আদালতের সিদ্ধান্তের উপর। আপাতত তিনি আমেরিকায়, আর এনআইএর তদন্ত চলছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ভারতে ফেরার কথা। সেই প্রত্যাবর্তন এবং মামলার পরবর্তী অগ্রগতিই ঠিক করবে, ‘স্বাধীনতার যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচিত এই মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আইনি পরিণতি কী হয়।




