বিশেষ প্রতিবেদন: বয়স বাড়ছে, অথচ সন্তানধারণের ইচ্ছা রয়ে গিয়েছে। কারও ক্ষেত্রে কেরিয়ার, কারও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, আবার কারও জীবনে উপযুক্ত সঙ্গীর সন্ধান পেতে সময় লেগেছে। কিন্তু তিরিশের মাঝামাঝি বা চল্লিশের কোঠায় পৌঁছে মাতৃত্বের পরিকল্পনা করতে গিয়ে অনেক মহিলাকেই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে, গুণগত মানেও অবনতি ঘটে। ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমার পাশাপাশি গর্ভপাতের ঝুঁকিও বাড়ে। এত দিন এই সমস্যার মোকাবিলায় ভরসা ছিল মূলত আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন। কিন্তু এ বার ডিম্বাণুর ভিতরে বয়সজনিত ত্রুটি কেন তৈরি হয়, সেই জৈবিক প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা তৈরির চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাথমিক গবেষণায় মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল। যদিও এই আবিষ্কার এখনই বয়সজনিত বন্ধ্যাত্বের নিশ্চিত সমাধান নয়, তবু ভবিষ্যতে আইভিএফের সাফল্য বাড়ানোর নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
বয়স বাড়লে ডিম্বাণুতে কী বদল ঘটে?
মহিলাদের ডিম্বাণুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ডিম্বাণুর প্রাথমিক কোষ তৈরি হয় ভ্রূণাবস্থাতেই। জন্মের পর নতুন করে বিপুল সংখ্যায় ডিম্বাণু তৈরি হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাশয়ে থাকা ডিম্বাণুর ভাণ্ডার ক্রমশ কমতে থাকে। বয়ঃসন্ধির সময়ে ডিম্বাণুর সংখ্যা আনুমানিক তিন থেকে চার লক্ষে নেমে আসে। তার পরেও প্রতি মাসে ডিম্বাণুর ভাণ্ডার থেকে কোষ কমতে থাকে। মেনোপজের সময় সেই ভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসে।
সমস্যা শুধু ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া নয়। বয়স বাড়লে ডিম্বাণুর ক্রোমোজোমের বিন্যাসেও ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। সুস্থ মানুষের অধিকাংশ দেহকোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। পরিণত ডিম্বাণু তৈরির সময় প্রতিটি জোড়া থেকে একটি করে ক্রোমোজোম থাকার কথা। কিন্তু কোষ বিভাজনের সময় প্রক্রিয়াটি ঠিকমতো না হলে কোনও ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের সংখ্যা বেশি বা কম হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যানিউপ্লয়ডি’।
এ ধরনের ত্রুটিযুক্ত ডিম্বাণু থেকে ভ্রূণ তৈরি হলেও তার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভ্রূণ জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত হয় না, আবার কখনও গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কুড়ির কোঠার মহিলাদের ক্ষেত্রেও কিছু ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের ত্রুটি থাকে। চল্লিশের বেশি বয়সে সেই হার অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। ফলে বয়সজনিত বন্ধ্যাত্বের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে ডিম্বাণুর এই ক্রোমোজোমগত সমস্যা।
ডিম্বাণুর ভিতরের ‘রক্ষাকবচ’ নিয়েই গবেষণা
জার্মানির গটিঙ্গেনের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি সায়েন্সেসের বিজ্ঞানী মেলিনা শুহ এবং তাঁর সহযোগীদের গবেষণায় ডিম্বাণুর বয়সজনিত ত্রুটির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত হয়েছে। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, ডিম্বাণু পরিণত হওয়ার সময় ক্রোমোজোমের জোড়াকে একসঙ্গে ধরে রাখতে সাহায্য করে ‘কোহেসিন’ নামের একটি প্রোটিন-সমষ্টি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। ফলে ক্রোমোজোমের সঠিক বিভাজন ব্যাহত হয় এবং ত্রুটিযুক্ত ডিম্বাণু তৈরির আশঙ্কা বাড়ে।
এই প্রক্রিয়ায় ‘শুগোশিন ১’ নামের আর একটি প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি কোহেসিনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। গবেষকদের ধারণা, ডিম্বাণু পরিণত হওয়ার সময় এই প্রোটিনের সুরক্ষামূলক ভূমিকা বাড়ানো গেলে ক্রোমোজোমের ভুল বিভাজন কমানো সম্ভব হতে পারে।
এই গবেষণার ভিত্তিতেই ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেলিনা শুহ ও তাঁর সহযোগী আগাতা জিয়েলিনস্কা ‘ওভো ল্যাবস’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। তাদের তৈরি পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ‘এমব্রায়োপ্রোটেক্ট ১’-এর লক্ষ্য, ডিম্বাণু পরিণত হওয়ার আগেই ক্রোমোজোমের ত্রুটি তৈরির ঝুঁকি কমানো।
ইঁদুরের ডিম্বাণুতে সাফল্য, মানুষের ক্ষেত্রেও আশার আলো
গবেষকেরা প্রথমে ইঁদুরের ডিম্বাণুতে এই পদ্ধতি পরীক্ষা করেন। তাঁদের দাবি, বয়স বাড়ার সঙ্গে ইঁদুরের ডিম্বাণুতে যে ক্রোমোজোমগত ত্রুটি বাড়ে, পরীক্ষামূলক চিকিৎসা প্রয়োগে তা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। চিকিৎসা করা ডিম্বাণু নিষিক্ত করে সুস্থ ইঁদুরের শাবকও জন্মেছে।
এর পরে আইভিএফের জন্য দান করা শতাধিক মানব ডিম্বাণুতে পরীক্ষাটি চালানো হয়। গবেষকদের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, চিকিৎসার পরে ক্রোমোজোমের স্বাভাবিক বিন্যাস বজায় রাখা ডিম্বাণুর অনুপাত বেড়েছে। বিশেষ করে ৩৪ থেকে ৪০ বছর বয়সি মহিলাদের ডিম্বাণুতে স্বাভাবিক ক্রোমোজোমের বিন্যাসের হার দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
তবে এই ফলকে এখনও চিকিৎসার চূড়ান্ত সাফল্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পরীক্ষাগারে ডিম্বাণুর ক্রোমোজোমের বিন্যাস স্বাভাবিক রাখা এবং সেই ডিম্বাণু থেকে সুস্থ শিশুর জন্ম—দুটি আলাদা বিষয়। চিকিৎসাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর, কতটা নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে সন্তানের স্বাস্থ্যে কোনও প্রভাব পড়ে কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় সংস্থার লক্ষ্যও ক্রোমোজোমের ত্রুটি কমানো
একই সমস্যার সমাধান খুঁজছে অক্সফোর্ডের ‘ইউ-প্লয়েড বায়োটেকনোলজিস’। সংস্থাটি ‘লাইভান্তা’ নামে একটি পরীক্ষামূলক অণু তৈরি করেছে। এর লক্ষ্য, ‘সেপারেজ’ নামের একটি উৎসেচকের কার্যকলাপ কমানো। এই উৎসেচক ক্রোমোজোমকে সঠিক ভাবে ধরে রাখার প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রোটিনের উপর প্রভাব ফেলে। গবেষকদের ধারণা, সেপারেজের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে কোহেসিনের ক্ষয় কমানো এবং ডিম্বাণুর ক্রোমোজোমগত ত্রুটি হ্রাস করা সম্ভব হতে পারে।
ইঁদুরের উপর পরীক্ষায় এই পদ্ধতি আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে বলে সংস্থাটির দাবি। এখন মানবকোষে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রাথমিক ফলাফলে চিকিৎসা করা ডিম্বাণুর মধ্যে স্বাভাবিক ক্রোমোজোমের বিন্যাসের হার বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এই গবেষণাও এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়েছে।
ওভো ল্যাবস আরও দুটি সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। একটি হল এমন কৃত্রিম কোহেসিন তৈরি করা, যা ডিম্বাণুর স্বাভাবিক কোহেসিনকে সাহায্য করতে পারে। অন্যটি, ডিম্বাণুর ভিতরে ক্রোমোজোমগুলিকে সঠিক ভাবে সাজিয়ে রাখতে সাহায্যকারী এক ধরনের প্রোটিনের কার্যকারিতা বাড়ানো। গবেষকদের মতে, ডিম্বাণুর ভিতরে ক্রোমোজোমের বিন্যাস স্থিতিশীল রাখা গেলে শুধু বেশি বয়সি মহিলাদের নয়, অপেক্ষাকৃত কম বয়সি মহিলাদের ক্ষেত্রেও আইভিএফের ফল উন্নত করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আইভিএফের বিকল্প, না কি সাফল্যের নতুন হাতিয়ার?
বর্তমানে বয়সজনিত বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে আইভিএফ একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপদ্ধতি। কিন্তু ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমে গেলে আইভিএফ করেও প্রত্যাশিত ফল নাও মিলতে পারে। বারবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক খরচের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক চাপও বাড়ে। সেই জায়গায় ডিম্বাণুর ভিতরে ক্রোমোজোমের ত্রুটি তৈরির প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা তৈরি করা গেলে আইভিএফের সাফল্য বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক গবেষণার ফল উৎসাহব্যঞ্জক হলেও মানুষের ক্ষেত্রে চিকিৎসার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণ করতে নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন। ডিম্বাণুর স্বাভাবিক বিকাশে হস্তক্ষেপের ফলে ভবিষ্যৎ সন্তানের উপর কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়ে কি না, সেটিও দীর্ঘমেয়াদে পরীক্ষা করতে হবে। তাই এই পদ্ধতিগুলি এখনই রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করার মতো অবস্থায় পৌঁছয়নি।
বিশ্বজুড়েই তুলনামূলক বেশি বয়সে সন্তানধারণের পরিকল্পনা করা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে বয়সজনিত বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতির চাহিদাও বাড়তে পারে। কিন্তু গবেষণার সাফল্যকে চিকিৎসার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আপাতত বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য, ডিম্বাণুর ভিতরে ত্রুটি কেন তৈরি হয়, তা আরও ভাল ভাবে বোঝা এবং সেই প্রক্রিয়াকে নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করা।
বয়স বাড়লে মাতৃত্বের সম্ভাবনা কমে—এটাই এত দিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠিন বাস্তবতা। নতুন গবেষণা সেই বাস্তবতা বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে পরীক্ষাগারের আশাকে নিরাপদ, কার্যকর চিকিৎসায় পরিণত করতে এখনও অনেক পথ বাকি।




