নিউজ ডেস্ক: যার চলচ্চিত্র মুক্তির আগেই মনোনীত হয় অস্কারের জন্য এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘পাম ডি'অর’ পেয়েছেন তিনি বহুবার, চলচ্চিত্রের চুড়ান্ত কারিগর বিখ্যাত ইরানি পরিচালক জাফর পানাহিকে তেহরানের একটি বিপ্লবী আদালত ৫ বছর ১ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে। একই সাথে তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং ২ বছরের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার ও বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপ নেওয়ার মূল কারণ এবং নেপথ্যের ঘটনাগুলো কারণ আসলে, সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমালোচনার ফল।
জাফর পানাহি দীর্ঘ দুই দশক ধরে তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইরানের রক্ষণশীল সমাজ, শাসনব্যবস্থা, নারীর অধিকার হরণ, সেন্সরশিপ ও দারিদ্র্যের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলছেন। তাঁর এই স্বাধীনচেতা কাজ ইরান সরকারের চরম অসন্তোষের কারণ। এছড়াও আদালতের গোপন ও একতরফা রায় যা পানাহির আইনজীবী মোস্তফা নিলি জানিয়েছেন, আদালতের এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ গোপনে এবং পরিচালকের অনুপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়েছে। সাজা দেওয়ার পূর্বে তাঁকে কোনো শুনানির নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে হঠাৎ তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হলে তাঁরা আদালতে খোঁজ নিয়ে এই ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিষয়ে জানতে পারেন। আদালতের নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ স্পষ্ট না করা হলেও, এটিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আর রয়েছে বিদেশে গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের পক্ষে মুখ খোলা, ২০২৫ সালে তাঁর নির্মিত ছবি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ কানের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘পাম ডি'অর’- এর সম্মান অর্জন করেন এবং অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার চলচ্চিত্র বিভাগেও মনোনীত হয়। এই ছবির প্রচারণার জন্য তিনি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে সফরে ছিলেন, তখন তিনি ইরানে গণতন্ত্রের দাবিতে চলা আন্দোলনের ওপর সরকারি দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে সরকারের নির্মম পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, যা ইরানি প্রশাসনকে ক্ষুব্ধ করে। সবশেষে রয়েছে অনতিপূর্বের ‘শাসনবিরোধী প্রপাগান্ডা’র সাজা। এর আগে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে তাঁকে অন্য একটি মামলায় ১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা ২০২৬ সালের জুনে উচ্চ আদালতে বহাল রাখা হয়। নতুন ৫ বছরের সাজার ফলে তাঁকে সব মিলিয়ে ৬ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটাতে হতে পারে।
এই সমস্ত ঝুঁকি সত্ত্বেও বার বার ইরানে ফিরেছিলেন এই মায়েস্ত্র পরিচালক। ২০২২ সালে ইরানে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বিক্ষোভে সংহতি জানানোর অপরাধে তিনি ৭ মাস কারাভোগের পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পান। এরপর আন্তর্জাতিক মহলে ছবি প্রচারের পর ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে তিনি স্বেচ্ছায় ইরানে ফিরে আসেন। গ্রেফতার ও সাজার চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন— “আমি এমন একজন মানুষ যার নিজের দেশে থাকা প্রয়োজন। আমি সেখানেই শ্বাস নিতে ও কাজ করতে চাই। তারা যদি সাজা কার্যকর করতে চায়, করুক। দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আমি বদলাবো না।” এছড়াও তার গৃহ বন্দি অবস্থায় থাকার সময় বানানো “দিস ইস নট এ ফিল্ম” সবার চোখের ফাঁক গোলে সেরা ছবির জন্য সম্মানিত হয়েছিল বার্লিনের চলচ্চিত্র উৎসবে। তখনের সময় কিছুই পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে ইরান সরকারের আরও কঠোর ও একতরফা রায় বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে ঝড় তুলেছে তীব্র নিন্দার।




