বিশেষ প্রতিবেদন: রাতের অন্ধকারে সূর্যের আলো! শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হলেও, সেই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে আমেরিকার মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’। পৃথিবীর কক্ষপথে হাজার হাজার আয়নাযুক্ত উপগ্রহ পাঠিয়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে রাতেও পৃথিবীর নির্দিষ্ট অংশ আলোকিত করতে চায় সংস্থাটি। লক্ষ্য, অন্ধকারে উদ্ধারকাজে সাহায্য করা, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় বাড়ানো এবং প্রয়োজনে আলো পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এই পরিকল্পনা ঘিরেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। পরিবেশবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, রাতের স্বাভাবিক অন্ধকারে কৃত্রিম ভাবে আলো ফেললে মানুষের ঘুম, বন্যপ্রাণীর জীবনচক্র এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এক পরিবেশ সংগঠনের আইনজীবীর কথায়, “এটি একটি নির্বোধ প্রকল্প।”
সম্প্রতি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার গ্রামীণ এলাকায় রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের দিক থেকে তীব্র আলো এসে পড়তে দেখে চমকে যান স্থানীয় বাসিন্দারা। জানা যায়, সেটি ছিল রিফ্লেক্ট অরবিটালের প্রযুক্তি পরীক্ষার অংশ। মহাকাশে আয়না বসিয়ে কী ভাবে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করা যায়, সেই সম্ভাবনা বোঝাতেই এই পরীক্ষা চালানো হয়। তবে পরীক্ষায় সরাসরি মহাকাশে আয়নাযুক্ত উপগ্রহ ব্যবহার করা হয়নি; মাটিতে শক্তিশালী আলোর সাহায্যে সম্ভাব্য প্রভাবের একটি নমুনা দেখানো হয়েছিল।
সংস্থার পরিকল্পনা আরও বড়। আগামী এক দশকে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রায় ৫০ হাজার আয়নাযুক্ত উপগ্রহ পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে তাদের। প্রতিটি উপগ্রহে থাকবে বড় প্রতিফলক আয়না। সেই আয়নায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় পাঠানো হবে। সংস্থার দাবি, প্রয়োজন অনুযায়ী আলোর তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করে অন্ধকার এলাকায় আলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
রাতেও চলবে সৌরবিদ্যুৎ?
এই প্রযুক্তির অন্যতম লক্ষ্য সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো। সাধারণত সূর্যের আলো না থাকলে সৌর প্যানেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় বা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। রিফ্লেক্ট অরবিটালের দাবি, মহাকাশের আয়না থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে সৌর প্যানেলে ফেলতে পারলে রাতেও কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়াও জরুরি পরিস্থিতিতে আলো পৌঁছে দেওয়া, ভেঙে যাওয়া রাস্তার আলোয় বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা এবং উদ্ধারকাজে সাহায্য করার সম্ভাবনার কথাও বলছে সংস্থাটি।
রাতে দুর্গম এলাকায় কেউ আটকে পড়লে বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরে উদ্ধারকাজ চালাতে হলে আলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থার বক্তব্য, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ধারকারী দলকে অন্ধকারে কাজ করতে সাহায্য করা যেতে পারে। তাদের দাবি, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলই হতে পারে এই পরিষেবার প্রথম দিকের গ্রাহক। তবে প্রযুক্তির সম্ভাবনা আর বাস্তবে তার কার্যকারিতা এক বিষয় নয়। রাতের আকাশে প্রতিফলিত সূর্যালোক কতটা কার্যকর হবে, কতক্ষণ তা নির্দিষ্ট এলাকায় রাখা যাবে, আবহাওয়া ও উপগ্রহের অবস্থান তার উপর কী প্রভাব ফেলবে—এমন একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
অনুমতি মিলেছে পরীক্ষামূলক উপগ্রহ পাঠানোর
আমেরিকার ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন বা এফসিসি গত জুলাইয়ে রিফ্লেক্ট অরবিটালের একটি পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, উপগ্রহটির আয়নার মাপ হবে প্রায় ৫৯ ফুট। সেই আয়নায় প্রতিফলিত আলো পৃথিবীর প্রায় তিন মাইল চওড়া এলাকায় পৌঁছতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে অনুমোদন পাওয়া মানেই গোটা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ছাড়পত্র পাওয়া নয়।
পরীক্ষামূলক উপগ্রহের ফলাফল, প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রযুক্তির বিরোধীরা অবশ্য প্রথম পরীক্ষা থেকেই সম্ভাব্য বিপদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তাঁদের মতে, রাতের অন্ধকার শুধু মানুষের বিশ্রামের সময় নয়, প্রকৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু প্রাণী রাতে খাবার খোঁজে, শিকার করে, চলাচল করে কিংবা প্রজনন-সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করে। কৃত্রিম আলো সেই স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
ঘুমের ছন্দ থেকে বন্যপ্রাণী, আশঙ্কা নানা ক্ষেত্রে
পরিবেশবিদদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ ‘লাইট পলিউশন’ বা আলোকদূষণ। শহরাঞ্চলে রাস্তার আলো, বিজ্ঞাপনের বোর্ড এবং বহুতলের আলোর কারণে রাতের আকাশ ইতিমধ্যেই অনেক জায়গায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মহাকাশ থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হলে সেই সমস্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। মানুষের শরীরের ঘুম-জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাতের অতিরিক্ত আলো ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
একই ভাবে পাখি, বাদুড়, পতঙ্গ এবং নিশাচর প্রাণীদের চলাফেরা ও আচরণেও কৃত্রিম আলোর প্রভাব পড়তে পারে। তবে মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত আলো বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্দিষ্ট ভাবে বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। পরিবেশ সংগঠন আর্থজাস্টিসের প্রবীণ আইনজীবী জান হাসেলম্যান এই প্রকল্পের সমালোচনা করে বলেছেন, এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং অমীমাংসিত প্রশ্নের সংখ্যা অনেক। তাঁর বক্তব্য, পৃথিবীর জীবজগৎ দিন ও রাতের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে মানিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। সেই ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আগে যথেষ্ট আলোচনা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ জরুরি।
তারাভরা আকাশ কি হারিয়ে যাবে?
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের আর একটি বড় কারণ মহাকাশ গবেষণা। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যালাক্সি এবং মহাবিশ্বের নানা বস্তু পর্যবেক্ষণের জন্য অন্ধকার আকাশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কৃত্রিম আলোর কারণে আকাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠলে ক্ষীণ জ্যোতিষ্কের আলো শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। আয়নাযুক্ত উপগ্রহ থেকে প্রতিফলিত আলোও মহাকাশ পর্যবেক্ষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
সমালোচকদের মতে, সমস্যা শুধু একটি উপগ্রহ নিয়ে নয়; ভবিষ্যতে বিপুল সংখ্যায় এমন উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো হলে তার সম্মিলিত প্রভাব কী হবে, তা আগে থেকেই খতিয়ে দেখা দরকার। উপগ্রহগুলির উজ্জ্বলতা নিয়ন্ত্রণ, কোন এলাকায় আলো ফেলা যাবে, কতক্ষণ তা চালু থাকবে এবং পরিবেশগত ক্ষতি হলে দায় কার—এমন প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
রিফ্লেক্ট অরবিটাল অবশ্য জানিয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই তারা কাজ করতে চায়। প্রযুক্তিটি মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য করতে পারে বলেই তাদের দাবি। কিন্তু সংস্থার যুক্তি ও সমালোচকদের আশঙ্কার মধ্যে এখনও বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।
মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে সূর্যের আলো ফিরিয়ে আনার ধারণা প্রযুক্তিগত ভাবে অভিনব হলেও, তা বাস্তবায়নের আগে পরিবেশ, স্বাস্থ্য, বন্যপ্রাণী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর সম্ভাব্য প্রভাবের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। রাতকে কৃত্রিম ভাবে আলোকিত করার প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাজে কতটা লাগবে, আর তার বিনিময়ে প্রকৃতিকে কতটা মূল্য দিতে হবে—সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




