নয়াদিল্লি: শীতের মরসুমেও স্বস্তি মিলবে না? প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা থেকে তৈরি হওয়া এল নিনোর প্রভাবে আগামী কয়েক মাসে ভয়াবহ তাপমাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা। তার জেরে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত ভারতে তাপজনিত কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপপ্রবাহের কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এই সংখ্যা নিশ্চিত মৃত্যুর হিসাব নয়, গবেষকদের তৈরি একটি পূর্বাভাস। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতির উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।
কী এই এল নিনো?
প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্ব অংশে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে যে প্রাকৃতিক জলবায়ুগত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় এল নিনো। এর প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার উপর তার প্রভাব পড়ে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর স্থায়িত্ব থাকে প্রায় ন’মাস থেকে এক বছর। তবে প্রতিটি এল নিনোর প্রভাব সমান হয় না।
কোনও ক্ষেত্রে খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়ে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতা নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে গবেষকদের মধ্যে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩.০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছিল। এই পরিস্থিতিকে কেউ কেউ ‘সুপার এল নিনো’ বলেও উল্লেখ করছেন।
মার্চ পর্যন্ত ভারতে মৃত্যুর আশঙ্কা ৫৫ হাজার
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে একটি বিশেষ ‘হিট মর্টালিটি ট্র্যাকার’ তৈরি করেছে ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব। গবেষকদের এই মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতে অতিরিক্ত প্রায় ৫৫ হাজার তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
এই পূর্বাভাসে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হল, ভারতে সম্ভাব্য মৃত্যুর বড় অংশ ঘটতে পারে আগামী বছরের মার্চে। শীতের মরসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। এই তালিকায় ভারতের সামান্য আগে রয়েছে নাইজেরিয়া। সেখানে একই সময়ের মধ্যে তাপজনিত কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৫৬ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২৯ হাজার এবং ব্রাজিলে প্রায় ১৯ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস দিয়েছে গবেষণা সংস্থাটি।
বিশ্বজুড়ে ৩ লক্ষ ৭৩ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, আগামী ছ’মাসে বিশ্বজুড়ে তাপজনিত কারণে অতিরিক্ত ৩ লক্ষ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এই হিসাব এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত তাপমাত্রার প্রভাবের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর এই পরিস্থিতির প্রভাব বেশি পড়তে পারে। কারণ, বহু এলাকায় প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়, পর্যাপ্ত পানীয় জল, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা না থাকলে বিপদের আশঙ্কা আরও বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ নাগরিক, বাইরে কাজ করেন এমন শ্রমিক এবং যাঁদের নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘক্ষণ অত্যধিক তাপমাত্রার মধ্যে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে। তার ফলে গুরুতর অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
শুধু গরম নয়, বদলে যেতে পারে বৃষ্টির ধরনও
এল নিনোর প্রভাব কেবল তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন বদলে যেতে পারে। কোথাও খরা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকে, কোথাও আবার অতিবৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে বর্ষার সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে একাধিক এল নিনো পর্বে ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্ক দেখা গিয়েছে।
তবে প্রতিবার একই পরিস্থিতি তৈরি হয় না। ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য পরিস্থিতি এবং স্থানীয় আবহাওয়াও বর্ষার উপর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে কৃষি, বিদ্যুতের চাহিদা, পানীয় জলের জোগান এবং জনস্বাস্থ্যের উপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কংক্রিটের বাড়ি, ঘনবসতি এবং যানবাহনের তাপের কারণে রাতেও তাপমাত্রা বেশি থাকার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মুম্বইয়ের দূষণ নিয়েও উদ্বেগ
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মুম্বইয়ের বায়ুদূষণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। SAFAR-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন প্রকল্প অধিকর্তা এবং বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের অধ্যাপক গুফরান বেইগের মতে, এল নিনোর প্রভাবে বৃহৎ পরিসরের বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হলে মুম্বইয়ের বাতাসে দূষণ ছড়িয়ে পড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। ফলে দূষণের সমস্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কী বলছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা?
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলতি বছরের এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। ডিসেম্বরের দিকে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছনোর আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সালের গোড়া পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে গবেষকদের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এই হিসাব অতীতের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক, স্থানীয় আবহাওয়া এবং মানুষের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার মতো বিভিন্ন বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি। বাস্তবে কত মানুষের মৃত্যু হবে, তা নির্ভর করবে তাপমাত্রার প্রকৃত গতিপ্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রস্তুতির উপর।
আগাম প্রস্তুতিই বাঁচাতে পারে প্রাণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে এখন থেকেই পরিকল্পনা করা জরুরি। তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা, পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষদের নিয়মিত খোঁজ রাখা, প্রচণ্ড গরমের সময় ভারী পরিশ্রম এড়ানো এবং শরীরে জলের ঘাটতি হতে না দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শহরাঞ্চলে গাছের সংখ্যা বাড়ানো, ছায়াযুক্ত জায়গা তৈরি এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা কার্যকর করাও প্রয়োজন।
এল নিনোর এই পূর্বাভাস তাই শুধু আবহাওয়ার খবর নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। মার্চ পর্যন্ত ভারতে ৫৫ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু গবেষকদের এই হিসাব স্পষ্ট করে দিচ্ছে, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি না থাকলে আগামী কয়েক মাসে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।




