কাঠমান্ডু: ভয়াবহ বন্যায় নেপালের চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়েছেন ছয় শ্রমিক। তাঁদের উদ্ধারে এবার এমন এক পদ্ধতির সাহায্য নিচ্ছেন উদ্ধারকারীরা, যা ভারতে বহু বছর আগেই নিষিদ্ধ হয়েছে। নাম ‘র্যাট-হোল মাইনিং’। যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো কঠিন হয়ে পড়ায় অত্যন্ত সরু জায়গায় হাতে হাতে মাটি ও পাথর সরিয়ে এগোচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
২৬ অগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের ধস থেকে ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়। উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় তার প্রভাব পড়ে। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষের এখনও খোঁজ মেলেনি। বন্যার জেরে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মধ্যেই চিলিমে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে শুরু হয়েছে বিশেষ অভিযান।
ভারত ও নেপালের যৌথ উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যেই ধসে যাওয়া সুড়ঙ্গের প্রায় ১৫০ মিটার অংশ পরিষ্কার করেছে। শেষবার শ্রমিকদের যে ভূগর্ভস্থ পাওয়ারহাউসের কাছে দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে উদ্ধারকারীরা তখনও প্রায় ৫০ মিটার দূরে ছিলেন। প্রথম দিকে বড় বড় পাথর সরাতে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও পরে জল জমে থাকা ধ্বংসস্তূপে সেই কাজ কঠিন হয়ে যায়। তখনই হাতে খননের পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়।
কী এই র্যাট-হোল মাইনিং?
মূলত কয়লা উত্তোলনের একটি পদ্ধতি এটি। সরু সুড়ঙ্গ তৈরি করে শ্রমিকরা হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকে হাতের সরঞ্জাম দিয়ে কয়লা বা মাটি-পাথর সরান। সাধারণত একজন মানুষ যাওয়ার মতো সরু জায়গাতেই এই কাজ করা হয়।
এই পদ্ধতির দু’টি প্রচলিত ধরন রয়েছে। একটিতে পাহাড়ের ঢালে অনুভূমিকভাবে সরু সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। অন্যটিতে উপর থেকে একটি উল্লম্ব গর্ত খুঁড়ে নিচে পৌঁছে সেখান থেকে বিভিন্ন দিকে সরু সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়।
ভারতের মেঘালয়ের পাতলা কয়লার স্তরগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হত। কিন্তু শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে ২০১৪ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত মেঘালয়ে র্যাট-হোল মাইনিং নিষিদ্ধ করে। পরে ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টও সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।
কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল?
র্যাট-হোল খনিতে নিরাপত্তার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। অনেক ক্ষেত্রে সুড়ঙ্গে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে না, দেওয়াল সুরক্ষিত করা হয় না এবং হঠাৎ জল ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পরিবেশের উপরও এর বড় প্রভাব পড়ে। মেঘালয়ের খনি এলাকায় খনির বর্জ্য ও অ্যাসিড মাইন ড্রেনেজের কারণে জলদূষণের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও অতীতে এই ধরনের খনিতে শিশু শ্রমিক ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে।
তাহলে উদ্ধারকাজে কেন ব্যবহার?
নিষিদ্ধ হওয়ার পরও উদ্ধার অভিযানে এই পদ্ধতির ব্যবহার একেবারে আলাদা পরিস্থিতির কারণে। ভারী যন্ত্রপাতি জলমগ্ন ও অস্থিতিশীল ধ্বংসস্তূপে আটকে যেতে পারে। যন্ত্রের কম্পনে আরও ধস নামার আশঙ্কাও থাকে।
২০২৩ সালে উত্তরাখণ্ডের সিলকিয়ারা সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ের সময়ও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। যান্ত্রিক ড্রিল আটকে যাওয়ার পর শেষ পর্যায়ে হাতে হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ৪১ জন শ্রমিককে উদ্ধার করেছিলেন প্রশিক্ষিত কর্মীরা।
চিলিমেতেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে। সরু সুড়ঙ্গে একজন করে ঢুকে হাতের সরঞ্জাম দিয়ে মাটি-পাথর সরানো হচ্ছে। পরে সেই ধ্বংসাবশেষ ট্রলি বা অন্য ব্যবস্থায় বাইরে নিয়ে আসা হচ্ছে। জল জমে গেলে তা বের করার জন্য পাম্পও ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানে নেপাল আর্মির সদস্যরা কাজ করছেন। ভারতীয় সেনা, NDRF এবং আন্তর্জাতিক সুড়ঙ্গ উদ্ধার বিশেষজ্ঞরাও পরামর্শ দিচ্ছেন। আপাতত জল জমে থাকা অংশই অন্যতম বড় বাধা। সেটি সরিয়ে দ্রুত শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে।
অর্থাৎ, যে পদ্ধতি সাধারণ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ভারতে আইনত নিষিদ্ধ, চরম উদ্ধার পরিস্থিতিতে সেই একই কৌশলই এখন ছয় শ্রমিকের কাছে পৌঁছনোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হয়ে উঠেছে।