নিউ ইয়র্ক: কয়েক সেকেন্ড আগেও দু’জন পাশাপাশি বসে। একজনকে হাসতে দেখা যাচ্ছে। অন্য জনকে টেনে কাছে আনছেন তরুণী। আর ঠিক তার পরেই ছুটে এল ট্রেন। মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল দুই তরুণ-তরুণীর জীবন। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি সাবওয়ে স্টেশনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণী এবং তাঁর বন্ধুর মৃত্যুর ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়ো ঘিরে এখন তীব্র চাঞ্চল্য। কেন তাঁরা রেললাইনে নেমেছিলেন, তা এখনও রহস্য। দুর্ঘটনা, মাদকাসক্ত অবস্থায় অসতর্কতা, নাকি ইচ্ছাকৃত ভাবে ট্র্যাকে যাওয়া—সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
মৃত দু’জনের নাম মালাইকা চিত্রে এবং নভম কউল। দু’জনেরই বয়স ২৪ বছর। নিউ জার্সির বাসিন্দা তাঁরা। ম্যানহাটনের লোয়ার ম্যানহাটনে স্প্রিং স্ট্রিট সাবওয়ে স্টেশনে রবিবার ভোরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় আনুমানিক রাত ৩টা ১৫ মিনিট নাগাদ দক্ষিণমুখী ৪ নম্বর ট্রেন স্টেশনে ঢোকার সময় দু’জনকে লাইনের উপর দেখতে পান চালক। জরুরি ব্রেক কষার চেষ্টা করা হলেও ট্রেন থামানো সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়।
ট্র্যাকে বসে ছিলেন দু’জন
ঘটনার আগে দু’জন কী ভাবে রেললাইনে চলে গেলেন, সেটাই তদন্তের মূল প্রশ্ন। পুলিশের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, ট্রেন চালক দূর থেকে দু’জনকে লাইনের উপর বসে থাকতে দেখেছিলেন। তিনি ট্রেন থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ট্রেনের গতি এবং দূরত্বের কারণে শেষ মুহূর্তে আর দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি। ঘটনার পর প্রায় ১০০ জন যাত্রীকে ট্রেন থেকে বার করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানা গিয়েছে।
‘হাসছিলেন মালাইকা’—কী দেখা গিয়েছে ভিডিয়োয়?
ঘটনার একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে। সেই ভিডিয়োয় দুই বন্ধুকে রেললাইনের উপর বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রেন চালকের বিবরণে মালাইকাকে হাসতে দেখা গিয়েছিল এবং তিনি নভমকে নিজের দিকে টানছিলেন। কয়েক মুহূর্ত পরই ট্রেন তাঁদের উপর দিয়ে চলে যায়। তবে ভিডিয়ো দেখে তাঁদের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়নি। তাঁরা কেন লাইনে নেমেছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এক জন আগে নেমেছিলেন? সাহায্য করতে নেমেছিলেন অন্য জন?
তদন্তকারীরা একটি সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন, হয়তো নভম প্রথমে কোনও ভাবে লাইনে পড়ে গিয়েছিলেন বা নিজে নেমেছিলেন। তাঁকে সাহায্য করতে মালাইকা নীচে নেমে থাকতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সূত্রে এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে এটি এখনও তদন্তাধীন এবং নিশ্চিত তথ্য নয়। ফলে ভিডিয়োয় দু’জনকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা গেলেও, তাঁরা কী ভাবে সেখানে পৌঁছলেন—সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
মাদকাসক্ত ছিলেন? খতিয়ে দেখছে পুলিশ
আর একটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা, ঘটনার সময় তাঁরা মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাবে ছিলেন কি না। কারণ, চলন্ত ট্রেনের মতো ভয়াবহ বিপদের সামনে থেকেও তাঁরা কেন ট্র্যাক থেকে সরে গেলেন না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
তবে এখনও পর্যন্ত মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণের কোনও সরকারি নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। টক্সিকোলজি পরীক্ষার ফলও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই এই সম্ভাবনাকে আপাতত তদন্তের অংশ হিসাবেই দেখা হচ্ছে।
আত্মহত্যার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি
আত্মহত্যার সম্ভাবনাও তদন্তকারীরা বিবেচনা করছেন। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, কোনও সুইসাইড নোট না পাওয়া মানেই ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়—তদন্তকারীরাও এখনও এমন কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছননি। অর্থাৎ, দুর্ঘটনা, কাউকে বাঁচাতে গিয়ে ট্র্যাকে নামা, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অসতর্কতা অথবা ইচ্ছাকৃত ভাবে ট্র্যাকে যাওয়া—সব সম্ভাবনাই এখনও খোলা।
দু’জনেই রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী
মালাইকা এবং নভম দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন। দু’জনেই নিউ জার্সির রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এবং ২০২৪ সালে স্নাতক হন। তাঁদের মৃত্যুতে বন্ধু ও পরিচিতদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মালাইকা নিউ জার্সির ডেটন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি রাটগার্স থেকে পাবলিক হেলথ নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং পরে একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থায় কাজ করছিলেন। পাশাপাশি ফার্মেসি নিয়ে উচ্চশিক্ষাও শুরু করেছিলেন। নভম ছিলেন সেরভিল, নিউ জার্সির বাসিন্দা। তিনিও রাটগার্সের প্রাক্তনী এবং আর্থিক তথ্য বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছিলেন বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানা গিয়েছে।
‘দু’জনেই স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত ছিল’
বন্ধু এবং প্রতিবেশীদের বক্তব্যে আরও স্পষ্ট হচ্ছে, এই মৃত্যুর অভিঘাত কতটা গভীর। তাঁদের পরিচিতরা দু’জনকেই প্রাণবন্ত, মেধাবী এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে চলা তরুণ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাই এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাঁদের মৃত্যু আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন তদন্তকারীদের নজর মূলত ঘটনার আগের কয়েক ঘণ্টার দিকে। তাঁরা কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন, কী অবস্থায় স্টেশনে পৌঁছেছিলেন এবং কী ভাবে দু’জন রেললাইনে গেলেন—এসব তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একটি ভিডিয়োতে ধরা পড়েছে শেষ কয়েকটি মুহূর্ত। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের আগের গল্পটাই এখনও অন্ধকারে। মালাইকা ও নভম কেন জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গায় গিয়ে বসেছিলেন—সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে নিউ ইয়র্ক পুলিশ।