চন্দননগর, রেশমি ব্যানার্জি: সম্পত্তির লোভ যে মানুষকে কতটা নির্মম করে তুলতে পারে, তারই ভয়াবহ নজির হুগলির তারকেশ্বরে। সম্পত্তির লোভে বাবাকে খুনের অভিযোগে ছেলে ও পুত্রবধূকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল চন্দননগর আদালত। মায়ের চোখের সামনে বৃদ্ধ বাবাকে গলা টিপে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত অমিত কোলে ও তার স্ত্রী পূজা কোলে, দুজনকেই বৃহস্পতিবার সাজা শোনানো হয়। নিহতের নাম আদিত্য কোলে। মামলায় নিহতের স্ত্রী সাবিত্রির প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উঠে আসে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, তারকেশ্বরের গৌরবাটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন আদিত্য কোলে। জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালের ৬-ই জুলাই রাতের খাবার খেয়ে তিনি দোতলার ঘরে ঘুমোতে যান। তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী পাশের ঘরে নাতনিকে নিয়ে শুয়েছিলেন। প্রায় রাত ১-টা নাগাদ হঠাৎ চিৎকার শুনতে পান তিনি। ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে দেখেন, বাইরের থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাবিত্রী দেবী চিৎকার শুরু করলে তাঁর নাতি এসে দরজা খুলে দেয়। এরপর, স্বামীর ঘরে গিয়ে তিনি ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান। তাঁর অভিযোগ, আদিত্যের বুকের উপর বসে ছিলেন তাঁর ছেলে অমিত। তাঁর হাতে ছিল দস্তানা। পাশে তাঁর পুত্রবধূ পুজা ছিলেন। মায়ের চোখের সামনে ছেলে তাঁর বাবাকে গলা টিপে খুন করে বলে অভিযোগ।
অভিযোগ আরও গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন সাবিত্রী দেবী জানান, তাঁর স্বামীর হত্যার পর তাকেও খুন করার চেষ্টা হয়েছিল। তাঁর দাবি, কোনওরকমে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি তাঁর দেওরের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরের দিন তারকেশ্বর থানায় ছেলে ও বৌমার নামে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ঘটনার দুমাস পরে পুলিশ চার্জশিট পেশ করে। সূত্রে খবর, চন্দননগর আদালতে চলা মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষীর নাম ছিল। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
সরকারি আইনজীবী শঙ্কর গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, সাবিত্রীর সাক্ষ্যই মামলায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তিনি আদালতে এই ঘটনাকে 'বিরলের মধ্যে বিরলতম' বলে উল্লেখ করে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাবাকে খুন করার সময় প্রমাণ লোপাটের জন্য অমিত গ্লাভস পরেছিলেন। তবে, অতিরিক্ত দায়রা বিচারক মানবেন্দ্র মোহন সরকার জানান, অপরাধের ভয়াবহতা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু অভিযুক্ত দম্পতির দুই সন্তান নাবালক। তাঁদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে দুজনকেই যাবজ্জীবন কারাদন্ডের নির্দেশ দেয় আদালত।
একদিকে সম্পত্তির লোভে বাবাকে খুনের অভিযোগ, অন্যদিকে মায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য-শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে দীর্ঘ বিচারপর্ব থামল। নিজের সন্তানই যখন বাবার মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, এই ঘটনা ফের প্রশ্ন তুলল মানবিকতা, সম্পর্কের মূল্যবোধ ও পরিবার নিয়ে।