নয়াদিল্লি: স্কুলের ক্লাসরুম। পাশাপাশি বসে পড়াশোনা করছে একঝাঁক পড়ুয়া। কারও সর্দি, কারও কাশি। আবার অফিসে পাশাপাশি ডেস্ক, বন্ধ ঘর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ—এক জনের হাঁচি-কাশি থেকে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে সংক্রমণ। দিল্লিতে H1N1-সহ মরসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার বাড়বাড়ন্তে তাই নজরের কেন্দ্রে চলে এসেছে স্কুল এবং অফিসের মতো ঘনবসতিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র। পরিস্থিতি সামলাতে স্কুলগুলিকে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লির শিক্ষা দফতর।
দিল্লিতে গত কয়েক সপ্তাহে H1N1 সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ২৬ অগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে রাজধানীতে H1N1 আক্রান্তের সংখ্যা ২,৪০০ পেরিয়েছে; এক দিনেই নতুন করে ১৩৮ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। বৃহত্তর ভাবে ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্তের সংখ্যাও প্রায় ৩,০০০-এর কাছাকাছি। ফলে হাসপাতালগুলিকেও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দিল্লির Directorate of Education সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং বেসরকারি স্কুলগুলিকে ‘Healthy School-Healthy Community’ পদ্ধতিতে সতর্কতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। পড়ুয়া এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত হাত ধোয়া, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ-নাক ঢেকে রাখা এবং অসুস্থ পড়ুয়াকে স্কুলে না পাঠানোর মতো পদক্ষেপে জোর দেওয়া হয়েছে। স্কুলগুলিকে সকালের প্রার্থনা, শ্রেণিকক্ষ, নোটিস বোর্ড এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেও সচেতনতার বার্তা ছড়াতে বলা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, স্কুল এবং অফিসকেই কেন এতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
কারণ, ইনফ্লুয়েঞ্জা মূলত শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় আক্রান্ত ব্যক্তির নাক-মুখ থেকে বেরোনো ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা অন্য মানুষের শরীরে ভাইরাস পৌঁছতে পারে। তার সঙ্গে রয়েছে হাত ও বিভিন্ন ব্যবহৃত জিনিসের মাধ্যমে সংক্রমণের সম্ভাবনা। একটি ক্লাসরুমে কয়েক ঘণ্টা ধরে বহু শিশু একসঙ্গে থাকছে, একই বেঞ্চ, দরজা, ডেস্ক কিংবা অন্যান্য জিনিস ব্যবহার করছে। ফলে একজন আক্রান্ত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমণের শৃঙ্খল তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
অফিসের ক্ষেত্রেও ছবিটা খুব আলাদা নয়। দীর্ঘ সময় পাশাপাশি বসে কাজ, বৈঠকের ঘর, লিফট, ক্যান্টিন এবং গণপরিবহণ—সব মিলিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ হয়। বিশেষ করে বন্ধ বা কম-বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরাও ভিড় এড়ানো, উপসর্গ দেখা দিলে বাড়িতে থাকা এবং প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন।
স্কুলগুলির ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যা হল, শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে তা শুধু স্কুলের মধ্যেই আটকে থাকে না। আক্রান্ত পড়ুয়া বাড়ি ফিরে বাবা-মা, দাদা-দাদি বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সংস্পর্শে আসে। অর্থাৎ একটি ক্লাসরুম থেকে সংক্রমণ পৌঁছে যেতে পারে একটি গোটা পরিবারের মধ্যে। বিশেষত বয়স্ক ব্যক্তি, ছোট শিশু এবং আগে থেকেই অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা জটিল আকার নেওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
তবে দিল্লির স্বাস্থ্য কর্তাদের বক্তব্য, আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, H1N1 কোনও নতুন ভাইরাস নয়। এটি বহু বছর ধরেই মানুষের মধ্যে মরসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি অংশ হিসেবে ঘুরছে। বর্তমানে ভাইরাসটির নতুন বা আরও ভয়ঙ্কর কোনও রূপ ছড়াচ্ছে—এমন প্রমাণও নেই। ICMR-ও জানিয়েছে, দেশে নতুন কোনও H1N1 স্ট্রেনের সন্ধান মেলেনি।
তবু সংখ্যার ঊর্ধ্বগতি উপেক্ষা করছে না প্রশাসন। দিল্লির হাসপাতালগুলিকে প্রস্তুতি বাড়াতে বলা হয়েছে। কোথাও আইসোলেশন বেডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, কোথাও আলাদা ‘ফ্লু কর্নার’ তৈরির প্রস্তুতি চলছে। LNJP হাসপাতালও H1N1 রোগীদের জন্য পৃথক পরিকাঠামো প্রস্তুত করেছে।
চিকিৎসকদের বার্তা তাই একটাই—জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে সেটিকে সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে স্কুল বা অফিসে যাওয়ার ঝুঁকি না নেওয়াই ভাল। অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে থাকা শুধু নিজের সুস্থতার জন্য নয়, আশপাশের মানুষকে সংক্রমণ থেকে বাঁচানোরও গুরুত্বপূর্ণ উপায়। নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
দিল্লির বর্তমান H1N1 পরিস্থিতি তাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—মহামারির আতঙ্ক নয়, বরং সামান্য সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণই সংক্রমণের গতি থামানোর প্রথম অস্ত্র। একটি হাঁচি-কাশিকে হালকা ভাবে নেওয়া যেমন বিপদ ডেকে আনতে পারে, তেমনই উপসর্গ দেখা দিলে কয়েক দিন বাড়িতে থাকা, হাত পরিষ্কার রাখা, ভিড়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া এবং শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই পারে স্কুল থেকে অফিস দুই জায়গাতেই সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে।