নয়াদিল্লি, অঙ্কন দাস: ভারত এবং জাপান তাদের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ও শিল্প-ভিত্তিক সক্ষমতার দিকে একধাপ এগোল। বৃহস্পতিবার ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং তাঁর জাপানি সমকক্ষ শিনজিরো কোইজুমি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য একটি নতুন মৌ-চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর পাশাপাশি তাঁরা নৌ-জাহাজ নির্মাণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি,লজিস্টিকস এবং সামরিক অনুশীলনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়ালেন। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ২০শে অগাস্ট, অর্থাৎ আজ এই বৈঠকের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উভয় দেশের দুই মন্ত্রী 'সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা' বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী 'মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস' বা সামুদ্রিক এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, ভারতীয় নৌবাহিনী ও জাপান মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফো(র্সের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজসহ মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগকালীন ত্রাণ তৎপরতার ক্ষেত্রে যৌথ কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়াও এই চুক্তিপত্রে নৌ-অভিযান বা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে ভারতের জন্য এই যৌথ বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হতে পারে শিল্প-খাতে সহযোগিতার বিষয়টি। একদিকে, জাপানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ভারতের উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে; নৌ-জাহাজ নির্মাণ ও নকশা তৈরির ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে 'মেক ইন ইন্ডিয়া' কাঠামোর আওতায় ভারতের উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন তারা। একইসঙ্গে, উভয় মন্ত্রী জাহাজ মেরামতের সুযোগ-সুবিধা পারস্পরিকভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজ করতে চান। অদূর ভবিষ্যতে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে সম্মত হয়েছেন।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের অংশীদার রূপে ভারত এবং জাপান ক্রমবর্ধমান আগ্রহের সাথে বিষয়টি চর্চা করছে। যা আন্তর্জাতিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। টোকিও প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় উৎপাদনের সুবিধাসহ ‘মোগামি-ক্লাস’ ফ্রিগেট (যুদ্ধজাহাজ) সরবরাহের প্রস্তাবটি নিয়ে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফ্রিগেট কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করা হলেও, সাম্প্রতিক এই বিবৃতিতে প্রস্তাবটির পেছনে থাকা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও শিল্পগত প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জাপান সম্প্রতি তাদের নীতিমালার যে পর্যালোচনা করেছে, তার প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সিং এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আরও গভীর সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
উভয় মন্ত্রী জাহাজে স্থাপনযোগ্য ‘ইউনিকর্ন’ ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিকেশনস অ্যান্টেনা প্রকল্পটিকে তাদের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইউনিকর্ন প্রকল্পটি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তরের প্রথম কোনো প্রকল্প। উভয় পক্ষই প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে নয়াদিল্লি ও টোকিও, উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইউনিকর্ন যেন কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ না থাকে। সাম্প্রতিক বিবৃতিতে কার্যগত প্রয়োজনীয়তার সাথে শিল্প, প্রযুক্তি ও উৎপাদনের বিষয়গুলোকে সংযুক্ত করে সেই ব্যবধান দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া, এতে মহাপরিচালক বা যুগ্ম-সচিব পর্যায়ের নেতৃত্বে একটি ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই দলটি কার্যক্রম, গোয়েন্দা তথ্য, সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও শিল্প- এই সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।
এই দুই দেশের সামরিক সম্পর্কটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভারত ও জাপান ‘ধর্ম গার্ডিয়ান’ এবং ‘জাইমেক্স’ গভীরতা বাড়াচ্ছে। জাপানের যুদ্ধবিমান প্রথমবারের মতো ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ‘বীর গার্ডিয়ান ২৬’ মহড়ায় অংশ নেবে। উভয় পক্ষই চালকবিহীন ব্যবস্থা বা ‘আনম্যানড সিস্টেম’র আরও নিবিড় সমন্বয় এবং স্বল্প সময়ের নোটিশে যৌথ মহড়া পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনে আগ্রহী। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়া তাদের প্রথম ত্রিপাক্ষিক নৌ-মহড়া ‘প্যাসেক্স’ সম্পন্ন করেছে। দেশ দুটি এখন যৌথ মহড়া ও উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে তৃতীয় কোনো দেশের সাথেও সম্পৃক্ততা বাড়াতে চায়।
উভয় মন্ত্রী এ বছর টোকিওতে অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ ভারত-জাপান ‘২+২’ (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করতেও সম্মত হয়েছেন। ভারত ও জাপান এমন একটি প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে যা কৌশল, সামরিক কার্যক্রম, প্রযুক্তি এবং শিল্প সক্ষমতাকে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করবে। নতুন গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপ, ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম’, ‘ইউনিকর্ন’ প্রকল্প এবং জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত সহযোগিতা; এসব উদ্যোগই প্রাথমিক ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতের জন্য সুযোগটি হলো জাপানের নিখুঁত কৌশল, উন্নত প্রযুক্তি এবং নৌ-ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সক্ষমতাকে কাজে লাগানো এবং একই সাথে নিজের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতাকে এর সাথে যুক্ত করা। জাপানের জন্যও ভারত সমান গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে এসেছে; উৎপাদন সক্ষমতা, বিশাল প্রতিরক্ষা বাজার এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি কৌশলগত অংশীদার। সাম্প্রতিক বৈঠক থেকে বোঝা যায়, উভয় পক্ষই এখন এই শক্তিগুলোকে একত্রিত করার গুরুত্ব ক্রমশ উপলব্ধি করছে। নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো কি বাস্তবে কার্যকর হবে? সামরিক প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা তৈরি করবে? নাকি প্রতিশ্রুতিশীল কৌশলগত অংশীদারিত্বের ইতিহাসে কেবল আরেকটি অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে? সেটা বলবে ভবিষ্যত।