নয়াদিল্লি: কোড লিখতে জানেন। নতুন সফ্টওয়্যার শিখেছেন। বছরের পর বছর অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তবু চাকরি নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় নেই! কারণ, প্রযুক্তির দুনিয়ায় নাকি দক্ষতার থেকেও এখন বেশি জরুরি হয়ে উঠছে ‘নেটওয়ার্ক’। অর্থাৎ, কে আপনাকে চেনেন, কার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ রয়েছে, কে আপনার হয়ে কথা বলতে পারেন—চাকরির বাজারে সেটিই হয়ে উঠছে বড় শক্তি। আর এই বদলের নেপথ্যে অন্যতম কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই—এমনই দাবি এক টেককর্মীর।
সমাজমাধ্যমে তাঁর একটি পোস্ট ঘিরেই শুরু হয়েছে আলোচনা। সেখানে তিনি কার্যত দাবি করেছেন, এআই এসে সফ্টওয়্যার শিল্পের পুরনো হিসাবটাই ওলটপালট করে দিয়েছে। আগে যে কাজ শেষ করতে একাধিক কর্মীর প্রয়োজন হত, এখন তার অনেকটাই করে ফেলতে পারে এআই-নির্ভর সফ্টওয়্যার। ফলে সংস্থাগুলির কাছে একই কাজের জন্য আগের মতো সংখ্যক কর্মী রাখার প্রয়োজন হচ্ছে না।
প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি নিয়োগে। বিশেষ করে কেরিয়ারের শুরুতে থাকা কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে বলে তাঁর দাবি। কারণ, একটি সংস্থায় নতুন কর্মী ঢুকে কয়েক বছর কাজ শিখবেন, অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, ধীরে ধীরে পদোন্নতি পাবেন—এই চেনা ‘কেরিয়ার সিঁড়ি’তেই নাকি ফাটল ধরেছে।
এআইয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। কম সময়ে বেশি কাজ করা যাচ্ছে। কিন্তু তার অর্থ যদি হয় কম কর্মী দিয়েই একই কাজ সামলে নেওয়া, তা হলে নতুন চাকরির সংখ্যা কমবে—এটাই ওই টেককর্মীর আশঙ্কা।
আর তখনই সামনে আসছে ‘নেটওয়ার্কিং’-এর প্রশ্ন।
তাঁর বক্তব্য, চাকরির বাজারে যখন প্রতিযোগিতা তীব্র, তখন শুধুমাত্র নিজের জীবনবৃত্তান্ত পাঠিয়ে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কমছে। বরং পরিচিত কেউ যদি কোনও সংস্থায় আপনার কাজের কথা জানেন, কোনও পদ খালি হওয়ার খবর আগে দেন বা আপনাকে সুপারিশ করেন, তা হলে সুযোগ পাওয়ার রাস্তা অনেকটাই সহজ হতে পারে। তাই তাঁর সোজা কথা—‘যাঁদের নেটওয়ার্ক আছে, তাঁরাই টিকে থাকবেন।’
তবে এই বক্তব্য নিয়ে সমাজমাধ্যমে বিতর্কও কম হয়নি। অনেকের পাল্টা যুক্তি, নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্ব নতুন কোনও বিষয় নয়। প্রযুক্তি শিল্পে সিনিয়র পদে উঠতে গেলে যোগাযোগ, নেতৃত্ব এবং নিজের কাজের পরিচিতি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এআই আসার আগেও শুধু কোডিং জানলেই দীর্ঘ কেরিয়ার নিশ্চিত হত না।
আবার অন্য একটি অংশের বক্তব্য, এআইয়ের প্রভাবকে হালকা করে দেখারও সুযোগ নেই। বিশেষ করে যে সমস্ত কাজ নিয়মমাফিক, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায়, সেগুলির ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন কমতে পারে। ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে ‘এন্ট্রি লেভেল’ চাকরিতে। নতুন কর্মীরা যদি সেই প্রথম সুযোগটাই না পান, তা হলে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন কী ভাবে—প্রশ্ন উঠছে সেটিই।
তবে এআই মানেই যে কর্মসংস্থানের শেষ, এমনটা বলছেন না অনেকেই। তাঁদের মতে, কাজের ধরন বদলাবে। কিছু পুরনো দায়িত্ব কমবে, আবার এআইকে ব্যবহার করে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে আগামী দিনে কর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন হবে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ এবং ব্যবসার প্রয়োজন বোঝার দক্ষতা।
অর্থাৎ, টেক দুনিয়ার নতুন মন্ত্র হয়তো শুধুই ‘কোড জানুন’ নয়। বরং এআইকে কাজে লাগান, নিজের দক্ষতা বাড়ান এবং মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি করুন।
‘নেটওয়ার্ক না থাকলে টিকে থাকা যাবে না’—এই মন্তব্য হয়তো চূড়ান্ত সত্য নয়। কিন্তু এআই যে চাকরির বাজারের পুরনো নিয়ম বদলে দিচ্ছে, সেই বাস্তবতা যে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ খুব বেশি নেই।




