নয়াদিল্লি: স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা ঘিরে ভারতের টেলিকম বাজারে ক্রমেই বাড়ছে উত্তাপ। এক দিকে ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্কের ভারতে ব্যবসা শুরুর অপেক্ষা, অন্য দিকে মুকেশ আম্বানির রিলায়্যান্স জিও-র নিজস্ব স্যাটেলাইট পরিষেবা চালুর প্রস্তুতি। এই আবহে প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ। সংস্থার বক্তব্য, দেশি-বিদেশি কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীকেই ভয় পায় না তারা। তবে জিও-র স্যাটেলাইট পরিষেবাও এখনও প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে স্টারলিঙ্কের প্রবেশ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে সামনে এল ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা।
শুক্রবার রিলায়্যান্সের তরফে জানানো হয়েছে, ভারতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দেশীয় এবং বিদেশি—সব সংস্থার জন্যই একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত। সরকারি নীতি মেনেই প্রত্যেক আবেদনকারীর ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া দরকার। সংস্থার দাবি, প্রতিযোগিতাকে তারা ব্যবসার স্বাভাবিক অঙ্গ হিসাবেই দেখে। শেষ পর্যন্ত যে সংস্থা গ্রাহকদের উন্নত পরিষেবা দিতে পারবে, তারাই বাজারে এগিয়ে থাকবে।
রিলায়্যান্সের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে টেলিকম বাজারে প্রবেশের সময় জিও-র হাতে কোনও গ্রাহক ছিল না। কিন্তু এক দশকের মধ্যে সেই সংস্থার গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটিরও বেশি হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে ইন্টারনেট পরিষেবা এবং ডিজিটাল পরিকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে জিও দেশের টেলিকম বাজারে বড় জায়গা করে নিয়েছে বলে দাবি সংস্থার। সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেই রিলায়্যান্স জানিয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রেও স্টারলিঙ্ক-সহ অন্য সংস্থার প্রবেশে তাদের আপত্তি নেই। তবে জিও-সহ প্রত্যেক সংস্থাকেই দেশের আইন ও নীতি মেনে চলতে হবে।
রিলায়্যান্সের এই বিবৃতির নেপথ্যে রয়েছে স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশ নিয়ে ইলন মাস্কের সাম্প্রতিক অভিযোগ। স্পেসএক্সের প্রধানের দাবি, ভারতের টেলিকম বাজারে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক স্বার্থ স্টারলিঙ্কের প্রবেশের পথে বাধা তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্য, এক দিকে বলা হচ্ছে, ভারতে প্রচলিত কম দামের ইন্টারনেট পরিষেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা স্টারলিঙ্কের পক্ষে কঠিন হবে; অন্য দিকে আবার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, স্টারলিঙ্ক বাজারে এলে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠবে। মাস্কের মতে, এই দুই যুক্তি পরস্পরবিরোধী। মাস্কের দাবি, নতুন সংস্থা বাজারে এলে গ্রাহকদের সামনে আরও বেশি বিকল্প তৈরি হবে। প্রতিযোগিতা বাড়লে পরিষেবার মান উন্নত হতে পারে এবং গ্রাহকদের সুবিধা হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান বাজারে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলির স্বার্থ রক্ষার জন্যই স্টারলিঙ্কের প্রবেশ নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে।
যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারত সরকার। রিলায়্যান্সও সরাসরি মাস্কের নাম না করে জানিয়েছে, কোনও সংস্থার ক্ষেত্রেই আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ভারতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবা চালুর দৌড়ে রয়েছে মূলত তিনটি সংস্থা—মাস্কের স্টারলিঙ্ক, মুকেশ আম্বানির জিও-র স্যাটেলাইট পরিষেবা এবং সুনীল ভারতী মিত্তলের গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স থাকলেও বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরু করার আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরীক্ষা, স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে হবে সংস্থাগুলিকে। কেন্দ্রীয় যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া জানিয়েছেন, স্যাটেলাইট যোগাযোগের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্যের সুযোগ দেওয়া হবে না। এই পরিষেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও স্পেকট্রাম ব্যবহারের মূল্য নির্ধারণের কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু করা সম্ভব নয়।
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, স্টারলিঙ্ককে ভারতে পরিষেবা চালু করতে হলে দেশের নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্থানীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলার শর্তও পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে বেস স্টেশন তৈরির মতো বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিকাঠামোর মাধ্যমে পরিষেবা পরিচালনা এবং আইন মেনে কাজ হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করা সহজ হয়। তবে সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ হলে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালুর ক্ষেত্রে নীতিগত আপত্তি নেই বলেই সরকারি অবস্থান। স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে ভারতের বাজার বিপুল সম্ভাবনাময়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, দ্বীপাঞ্চল এবং যেখানে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ড পৌঁছতে সমস্যা হয়, সেখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার পাশাপাশি পরিষেবার দাম, স্পেকট্রাম ব্যবহারের খরচ, নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামো তৈরির শর্তও বাণিজ্যিক সাফল্যের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নেবে।
এখনও পর্যন্ত স্টারলিঙ্ক, জিও এবং ওয়ানওয়েবের পরিষেবা চালুর পথে চূড়ান্ত অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে রয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানানোর বার্তা দিলেও রিলায়্যান্সের নিজের পরিষেবাও অনুমোদনের অপেক্ষায়—এই তথ্যই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মাস্কের অভিযোগের জবাবে সংস্থার বক্তব্য স্পষ্ট: বাজারে প্রতিযোগিতা চলুক, তবে প্রত্যেককেই একই আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সরকারি ছাড়পত্র কবে মেলে এবং কোন সংস্থা আগে পরিষেবা চালু করতে পারে, এখন সেদিকেই নজর টেলিকম শিল্পের।





