স্পোর্টস ডেস্ক: নিজের আদর্শকে হারানোর স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে পারেন ক’জন? মাত্র ১৮ বছর বয়সে সেই অসাধ্যসাধন করলেন ভারতের অনাহত সিং। যাঁর খেলা দেখে বড় হয়েছেন, যাঁর সাফল্য দেখে নিজেকে তৈরি করার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, সেই মিশরের স্কোয়াশ কিংবদন্তি নুর এল শেরবিনিকে হারিয়ে দিলেন ভারতীয় তরুণী। শুধু জয় নয়, আট বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে সরাসরি তিনটি গেমে হারিয়ে কেরিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় সাফল্য তুলে নিলেন অনাহত। যুক্তরাষ্ট্রে পিএসএ গোল্ড পর্যায়ের সিলিকন ভ্যালি ওপেনে এই জয়ের সুবাদে কোয়ার্টার ফাইনালেও পৌঁছে গেলেন তিনি।
বিশ্ব ক্রমতালিকায় ১৫ নম্বরে থাকা অনাহত বৃহস্পতিবারের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিলেন বিশ্বের তিন নম্বর খেলোয়াড় শেরবিনির। মিশরের এই তারকা শুধু প্রতিযোগিতার শীর্ষ বাছাই ছিলেন না, মহিলাদের স্কোয়াশে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্যতম প্রভাবশালী নামও তিনি। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে আটটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের খেতাব। এমন একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে লড়াই যে সহজ হবে না, তা জানতেন অনাহতও। কিন্তু কোর্টে নেমে প্রতিপক্ষের খ্যাতি বা অভিজ্ঞতাকে বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না ভারতীয় তরুণী।
১১-৮, ১১-৮, ১১-৭ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেন অনাহত। মাত্র ৩০ মিনিটের লড়াইয়ে শেরবিনিকে হারিয়ে দেন তিনি। তিনটি গেমেই ভারতীয় খেলোয়াড়ের নিয়ন্ত্রণ এবং চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রাখার ক্ষমতা নজর কেড়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় গেমে শেরবিনি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলিতে নিজের দখল বজায় রাখেন অনাহত। ফলে ম্যাচ পাঁচ গেমে গড়ানোর কোনও সুযোগই দেননি তিনি।
এই জয় অনাহতর কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় ম্যাচের পর তাঁর প্রতিক্রিয়া থেকেই। নিজের ছোটবেলার আদর্শকে হারিয়ে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না ভারতীয় খেলোয়াড়। তিনি বলেন, ‘আমি ওঁর প্রতিটি ম্যাচ দেখে বড় হয়েছি। আমাদের দু’জনের কোচও একই, গ্রেগ। আমি ওঁকে শ্রদ্ধা করি। নিজের কেরিয়ারেও ওঁর মতো সাফল্য অর্জন করতে চাই। স্কোয়াশের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের কাছেই উনি অনুপ্রেরণা।’
শেরবিনির বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে অনাহত জানতেন, নিজের সেরাটা দিতে পারলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা সম্ভব। ভারতের জাতীয় কোচও তাঁকে সেই আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলেন। অনাহতর কথায়, ‘ম্যাচের আগে ভারতের জাতীয় কোচ আমার সঙ্গে ছিলেন। উনি বলেছিলেন, আমি যদি নিজের সেরাটা খেলতে পারি, তা হলে জেতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’
কিন্তু ম্যাচ যে এমন হবে, তা নিজেও ভাবেননি অনাহত। তাঁর কথায়, ‘ওঁর সঙ্গে একই কোর্টে খেলতে পারাটাই আমার কাছে বিরাট ব্যাপার ছিল। আমি প্রথম বার ওঁর বিরুদ্ধে খেলছিলাম। ভেবেছিলাম, শুরুতে কিছুটা সময় লাগবে মানিয়ে নিতে এবং কী ভাবে খেলতে হবে বুঝতে। কিন্তু আমার পরিকল্পনা বেশ ভালো কাজ করেছে। আমি সেই পরিকল্পনায় স্থির থেকেছি। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে শেষ পর্যন্ত জয়টা আমার দিকেই এসেছে।’
চলতি বছরে অনাহতর উত্থান ভারতীয় স্কোয়াশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর আগে জুনিয়র বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তিনি। এশিয়ান গেমসেও মহিলাদের ব্যক্তিগত বিভাগে রুপো জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন। সেই প্রতিযোগিতায় ভারতের মহিলা স্কোয়াশে ব্যক্তিগত বিভাগে প্রথম পদক এনে দিয়েছিলেন অনাহত। এ বার পেশাদার সার্কিটে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে হারিয়ে নিজের উন্নতির আরও একটি প্রমাণ দিলেন তিনি।
সিলিকন ভ্যালি ওপেনের প্রথম রাউন্ডেও সরাসরি তিন গেমে জিতেছিলেন অনাহত। মিশরের নুর আবুলমাকারিমকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছেছিলেন তিনি। কিন্তু শেরবিনির বিরুদ্ধে জয় নিঃসন্দেহে অন্য মাত্রার। কারণ, এই ম্যাচে শুধু পরের রাউন্ডে ওঠাই লক্ষ্য ছিল না, নিজের আদর্শের বিরুদ্ধে খেলার চাপ সামলে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করাটাও ছিল বড় পরীক্ষা।
স্কোয়াশে আগামী দিনে আরও বড় মঞ্চে খেলার স্বপ্ন দেখছেন অনাহত। ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সে প্রথম বার অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে এই খেলা। ফলে ভারতীয় তরুণীর সামনে নিজেকে আরও মেলে ধরার সুযোগ রয়েছে। তবে এখনই ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি ভাবতে চান না তিনি। শেরবিনির মতো কিংবদন্তিকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দই আপাতত তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
১৮ বছরের অনাহতর এই জয় ভারতীয় স্কোয়াশের জন্যও বড় খবর। অভিজ্ঞতা, খেতাব এবং বিশ্ব ক্রমতালিকার ব্যবধান সত্ত্বেও যে সাহস ও পরিকল্পনা দিয়ে সেরাদের হারানো যায়, তা দেখিয়ে দিলেন তিনি। নিজের আদর্শকে হারিয়ে অনাহত শুধু একটি ম্যাচ জেতেননি, আন্তর্জাতিক স্কোয়াশে নিজের পরিচিতিকেও আরও উজ্জ্বল করলেন।




