পটনা: বিহারে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর কেটে গিয়েছে প্রায় দশ বছর। ২০১৬ সালে রাজ্যে মদ বিক্রি ও সেবনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল নীতীশ কুমার সরকার। সেই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ছিল নেশাজনিত অপরাধ, পারিবারিক অশান্তি এবং সামাজিক ক্ষতি কমানো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের সামনে দেখা দিয়েছে নতুন বিপদ। মদের বদলে অন্য নেশার দ্রব্যের দিকে ঝুঁকছেন বহু মানুষ। বিশেষ করে গাঁজা, হেরোইন, ব্রাউন সুগার, স্ম্যাক এবং বিভিন্ন নেশার ওষুধের বেআইনি কারবার প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিহারে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিবেশী অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সীমান্তপথে নজরদারির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় রয়েছে পাচারকারীরা। এর প্রভাব পড়ছে শহর থেকে গ্রাম—দুই ক্ষেত্রেই। কম দামে নেশার দ্রব্য পাওয়ার সুযোগ তরুণদের একটি অংশকে আরও বেশি করে আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রশাসনিক আধিকারিক ও চিকিৎসকেরা।
মদ নিষিদ্ধ, কিন্তু মাদক মামলায় চার গুণ বৃদ্ধি
বিহারে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে রাজ্যে মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছিল ৫১৮। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৪১১-তে। অর্থাৎ, কয়েক বছরের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা প্রায় চার গুণেরও বেশি হয়েছে। শুধু মামলা নয়, মাদকদ্রব্য বাজেয়াপ্ত করার পরিমাণেও বড়সড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছে।
বিহার পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যেখানে ৪৯৬ জনকে মাদকদ্রব্য ও মনঃপ্রভাবকারী পদার্থ সংক্রান্ত আইন বা এনডিপিএস আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১,৮১৩-তে। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, মদ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণও রাজ্য প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তবে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই মাদক সেবনের প্রকৃত হার একই অনুপাতে বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাত্রা বাড়লেও নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা বাড়তে পারে।
গাঁজা থেকে ব্রাউন সুগার, বাড়ছে বিকল্প নেশার প্রবণতা
বিহার পুলিশের আধিকারিকদের বক্তব্য, মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর গ্রামাঞ্চলে গাঁজার ব্যবহার এবং শহরাঞ্চলে হেরোইনজাতীয় নেশার প্রবণতা বেড়েছে। তরুণদের একাংশ মেথামফেটামিন, ব্রাউন সুগার এবং কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপের মতো পদার্থের অপব্যবহারেও জড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, মদ না পেয়ে বিকল্প নেশার দ্রব্যের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কারণ, কিছু মাদক সহজে পাওয়া যায়, আবার কিছু পদার্থ তুলনায় কম দামে বিক্রি হয়। ফলে আর্থিক ভাবে দুর্বল পরিবারের তরুণদের মধ্যেও আসক্তির ঝুঁকি বাড়ছে। তবে মদ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তই সরাসরি মাদক ব্যবহারের বৃদ্ধির একমাত্র কারণ, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। মাদকের সহজলভ্যতা, পাচারচক্র, বেকারত্ব, সামাজিক পরিস্থিতি এবং চিকিৎসার সুযোগের অভাবের মতো একাধিক বিষয়ও এই সমস্যার সঙ্গে জড়িত।
বাজেয়াপ্ত মাদকের পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
বিহার পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কয়েক ধরনের মাদক বাজেয়াপ্ত করার পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে মাত্র ১৫ কেজি ডোডা বা পোস্তের খোসা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫,২৩৫ কেজিতে। একই সময়ে চরস বাজেয়াপ্ত করার পরিমাণ ৮৮ কেজি থেকে বেড়ে ২৭৭ কেজি হয়েছে। স্ম্যাক বা হেরোইনজাতীয় মাদক বাজেয়াপ্ত করার পরিমাণও বেড়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে ২২০ গ্রাম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ কেজি।
এ ছাড়াও রাসায়নিক মাদক এবং ওষুধের অপব্যবহার রুখতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ২০১৬ সালে ২৯,৮৬১ বোতল, ৫,১১৬টি ট্যাবলেট এবং ৪,৯৪৫টি ইঞ্জেকশন বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে প্রায় ১.১৭ লক্ষ বোতল, ৯০,১৫০টি ট্যাবলেট এবং ৬৩,২০৮টি ইঞ্জেকশনে। এই পরিসংখ্যান মাদক পাচার ও বেআইনি সরবরাহের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের ছবি তুলে ধরছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, শুধু অভিযান ও গ্রেফতারির মাধ্যমে কি এই সমস্যার মোকাবিলা সম্ভব?
চিকিৎসাকেন্দ্রেও বাড়ছে আসক্তির সমস্যা
মাদক সমস্যার প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল ও নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলিতেও। পটনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসের চিকিৎসকেরা গত কয়েক বছরে মাদকাসক্ত রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন বেড়েছে বলে জানিয়েছেন। চিকিৎসকদের বক্তব্য, হেরোইন, ব্রাউন সুগার, গাঁজা, ডোডা এবং বিভিন্ন ধরনের নেশার দ্রব্যে আসক্ত রোগীরা চিকিৎসার জন্য আসছেন। কিছু ক্ষেত্রে আঠা, হোয়াইটনার এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ শুঁকে নেশা করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্যগত সমস্যাও। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। নেশার মাত্রা বাড়লে অনেকের স্বাভাবিক জীবনযাপন, পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং পারিবারিক সম্পর্কও ব্যাহত হয়। তাই মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আসক্তদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।
সীমান্তপথে পাচার, নজরদারিতে বড় চ্যালেঞ্জ
বিহারের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচার রুখতে প্রশাসনের সামনে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। উত্তর-পূর্ব ভারত এবং নেপালের সঙ্গে যোগাযোগের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে পাচারকারীরা মাদক পরিবহণের চেষ্টা করছে বলে তদন্তকারী আধিকারিকদের দাবি। পাচারকারীরা কখনও ছোট প্যাকেট, কখনও অন্য পণ্যের আড়ালে মাদক সরবরাহ করছে। ফলে গোটা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির স্থানীয় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু রাজ্য পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। আন্তঃরাজ্য সমন্বয়, সীমান্তে নজরদারি, আর্থিক লেনদেনের তদন্ত এবং পাচারচক্রের মূল মাথাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় স্তরে মাদকের চাহিদা কমানোর উদ্যোগও জরুরি।
শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন নেশামুক্তির ব্যবস্থাও
বিহারের অভিজ্ঞতা মদ নিষিদ্ধ করার নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। এক দিকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে বিপুল পুলিশি তৎপরতা প্রয়োজন হচ্ছে। অন্য দিকে, মাদক পাচার ও আসক্তির সমস্যা মোকাবিলায় প্রশাসনকে বাড়তি সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি নেশার বিকল্প ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্কুল-কলেজে প্রচার, পরিবারকে যুক্ত করে কাউন্সেলিং, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধুমাত্র অপরাধী হিসেবে দেখলে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন উপেক্ষিত হতে পারে। আবার পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নতুন করে নেশার দ্রব্যের সরবরাহ বন্ধ করাও কঠিন। তাই আইন প্রয়োগ এবং জনস্বাস্থ্য—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিহারে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার দশ বছর পরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হয়েছে? মদের সহজলভ্যতা কমানোর চেষ্টা চললেও অন্য নেশার দ্রব্যের বিস্তার নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশাসনের সামনে এখন দ্বিমুখী লড়াই—এক দিকে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক ভাঙা, অন্য দিকে আসক্তির কবলে পড়া মানুষকে চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া।





