শ্রীনগর: উপত্যকায় এত দিন আড়ালে থেকে কাজ করার পরে এ বার প্রকাশ্যে সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর পথে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)-এর শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ (বিএমএস)। দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার আওয়ান্তিপোরার বারসু গ্রামে সংগঠনটির প্রথম প্রকাশ্য বিভাগীয় দফতর চালু হয়েছে। আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত কোনও সংগঠনের কাশ্মীরে এই ধরনের প্রকাশ্য দফতর স্থাপনকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে নতুন দফতর ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিএমএসের কাশ্মীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সমীর কুচে স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের সংগঠন বিজেপি বা অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের ‘পুতুল’ নয়।
বারসু গ্রামের একটি সরু গলি ধরে পৌঁছতে হয় একতলা দফতরটিতে। বাইরে নিরাপত্তার জন্য ক্যামেরা ও লোহার রেলিং রয়েছে, মোতায়েন রয়েছেন পুলিশকর্মীরাও। তবে বাইরে কোনও বড় সাইনবোর্ড বা পতাকা নেই। ছোট একটি বোর্ডে শুধু লেখা ‘অফিস’। এই দফতর থেকেই উপত্যকায় শ্রমিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বিএমএস। দীর্ঘদিন ধরেই কাশ্মীরে আরএসএস এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলির উপস্থিতি তুলনামূলক ভাবে আড়ালে ছিল। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ করে নীরবে সাংগঠনিক কাজ চালানোর পাশাপাশি সেবা ভারতীর মতো সংগঠন স্কুল পরিচালনা এবং প্রাচীন মন্দির সংস্কারের কাজ করেছে। কিন্তু এ বার প্রকাশ্যে দফতর খোলার সিদ্ধান্তকে সংগঠনের কার্যকলাপ আরও দৃশ্যমান করার চেষ্টা হিসাবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিএমএসের কাশ্মীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সমীর কুচের কথায়, উপত্যকার পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে বলেই তাঁরা প্রকাশ্যে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর দাবি, কাশ্মীরে বিএমএসের সঙ্গে যুক্ত ২০টি শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। দক্ষিণ কাশ্মীরের চারটি জেলায় সংগঠনটির উপস্থিতি রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। শ্রীনগর এবং দক্ষিণ কাশ্মীর—দুই এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা থাকায় আওয়ান্তিপোরাকে বিভাগীয় দফতরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য।
কুচের নিজের অভিজ্ঞতাও উপত্যকায় সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত থাকার জটিলতা তুলে ধরে। ২০১৬ সালে তিনি আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় কাশ্মীরে জঙ্গি কার্যকলাপ নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছিল। কুচের দাবি, সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে নিজের বাড়িতেও তাঁকে সামাজিক দূরত্বের মুখে পড়তে হয়েছিল। জাতীয় পতাকা তোলার একটি ভিডিয়ো ফেসবুকে পোস্ট করার পরে ১,৩৮৪টি মন্তব্যের মধ্যে ১,৩৮২টিই গালিগালাজ ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে করেন কুচে। তাঁর মতে, ২০১৯ সালের পর থেকে উপত্যকায় শান্তি ও উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং সেই পরিবর্তনের ফলে সংগঠনের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের অগস্টে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর থেকে উপত্যকায় আরএসএস এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলি নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার প্রশ্নে বিএমএসের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কুচের দাবি, তাঁদের সংগঠনের কাজ ধর্ম বা রাজনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না। শ্রমিক ও কর্মচারীদের অধিকার রক্ষাই প্রধান লক্ষ্য। তাঁর কথায়, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের পুতুল নন; যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করলে তাকে সমর্থন করা হবে, আর শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে তার বিরোধিতা করা হবে।
অন্য দিকে, উপত্যকার বিজেপি নেতারা এই দফতর সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন। ফলে এক দিকে বিএমএস নিজেদের রাজনৈতিক দল থেকে স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, অন্য দিকে বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সংগঠনটির সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন সিপিএম নেতা তথা সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নসের (সিটু) প্রধান এম ওয়াই তারিগামি। তাঁর অভিযোগ, উপত্যকায় আরএসএসের এই ধরনের সাংগঠনিক বিস্তারকে সরকারি ব্যবস্থার মদতপুষ্ট উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর মতে, আরএসএসের আদর্শ ও সংখ্যালঘুদের বিষয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে কাশ্মীরে স্বাধীন শ্রমিক আন্দোলনের পরিসর যথেষ্ট নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, পুলওয়ামার বারসু গ্রামে বিএমএসের দফতর খোলা শুধু একটি শ্রমিক সংগঠনের নতুন কার্যালয় স্থাপনের ঘটনা নয়। ২০১৯ সালের পর কাশ্মীরে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলির প্রকাশ্য উপস্থিতি বাড়ানোর যে প্রচেষ্টা চলছে, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব এটি। তবে নতুন দফতর শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবে এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সংগঠনটি কতটা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের কাজের উপর।





