শিলং, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: শিলংয়ে অশান্তির আঁচ এ বার পৌঁছে গেল সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনে। অসম-মেঘালয় সীমান্তে টানাপড়েন, রাস্তা অবরোধ, গাড়ি চলাচলে বাধা—তার মধ্যেই অসম থেকে মেঘালয়ে পেট্রল, ডিজ়েল এবং রান্নার গ্যাসের জোগান বন্ধের হুমকি দিল নর্থ-ইস্ট পেট্রোলিয়াম মজদুর ইউনিয়ন (NEPMZ)। আর সেই খবর ছড়াতেই শিলংয়ের পেট্রল পাম্পগুলিতে হুড়োহুড়ি। ট্যাঙ্ক ভর্তি করতে একের পর এক গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। কোথাও লাইন এতটাই দীর্ঘ হয় যে, পাম্পের বাইরে রাস্তাতেও যানজট তৈরি হয়।
এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই—সত্যিই কি জ্বালানির আকাল দেখা দিতে চলেছে মেঘালয়ে? প্রশাসনের তরফে এখনও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি-সঙ্কটের কথা বলা হয়নি। কিন্তু অসমের উপর দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত নির্ভরশীল হওয়ায় পরিবহণ বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি যে দ্রুত চাপের দিকে যেতে পারে, সেই আশঙ্কাই সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। মেঘালয়ে খাদ্য, জ্বালানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বড় অংশই সড়কপথে অসম হয়ে আসে। ফলে সীমান্তে অবরোধ যত দীর্ঘ হবে, উদ্বেগও তত বাড়বে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার। খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (KSU)-এর একটি কালো পতাকার বাইক মিছিলকে কেন্দ্র করে শিলংয়ে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে। পুলিশের হিসাবে, অন্তত ৩১টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার অধিকাংশই অসমের নম্বরের গাড়ি বলে খবর। বেশ কয়েক জন যাত্রী ও পথচারীও আক্রান্ত হন। এই ঘটনার পরেই দুই রাজ্যের সীমান্তে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে।
শিলংয়ের ঘটনার পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা যায় অসমে। মেঘালয়ে যাতায়াত করা গাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে সরব হন অসমের পরিবহণকর্মী ও চালকেরা। জোরাবাট এবং খানাপাড়ার কাছে শুরু হয় অবরোধ। মেঘালয়ের গাড়ি অসমে ঢোকা এবং অসমের গাড়ি মেঘালয়ে যাওয়ার পথে বাধা তৈরি হয়। শুক্রবারও সেই অচলাবস্থা অব্যাহত ছিল। যাত্রীদের একাংশকে জোরাবাটে নামিয়ে অসমের গাড়িতে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। জরুরি পরিষেবা ও অ্যাম্বুল্যান্স অবশ্য অবরোধের আওতার বাইরে রাখা হয়।
এর মধ্যেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে পেট্রোলিয়াম শ্রমিক সংগঠনের সিদ্ধান্ত। NEPMZ জানিয়েছে, মেঘালয়ে অসমের নম্বরের গাড়ি এবং চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পেট্রল, ডিজ়েল ও LPG নিয়ে ট্যাঙ্কার পাঠানো হবে না। অর্থাৎ সীমান্তের অশান্তি এবার সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। সংগঠনের আশঙ্কা, অশান্তির মধ্যে ট্যাঙ্কার এবং চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
আর এই ঘোষণার পরেই শিলংয়ের পাম্পগুলিতে শুরু হয় ‘প্যানিক বাইং’। কেউ গাড়ির ট্যাঙ্ক পুরো ভর্তি করছেন, কেউ আবার অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করার চেষ্টা করছেন। ফলে পাম্পগুলির সামনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি। সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে—এই আশঙ্কাই যেন মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
শুধু জ্বালানি নয়, অশান্তির পরিধিও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মেঘালয়ের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি সম্পত্তিতে আগুন এবং পেট্রল বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। শিলংয়ের একটি পুলিশ আউটপোস্টে পেট্রল বোমা ছোড়া হয়। রি-ভই এলাকায় সরকারি গাড়ি ও মোটরবাইকে আগুন লাগানোর অভিযোগ ওঠে। দক্ষিণ-পশ্চিম খাসি হিলসেও একটি সরকারি দফতরে পেট্রল বোমা ছোড়া হয়। ঘটনায় কেউ আহত না হলেও পরিস্থিতির উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্র মেঘালয়ে পাঁচ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে—চার কোম্পানি CRPF এবং এক কোম্পানি RAF। লক্ষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজ্য পুলিশকে সাহায্য করা এবং নতুন করে হিংসা ছড়ানো আটকানো।
এদিকে দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা উত্তেজনা কমিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। দু’পক্ষের মধ্যে যোগাযোগও চলছে।
কিন্তু রাজনীতির আলোচনার বাইরে এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা সাধারণ মানুষের। রাস্তা বন্ধ হলে আটকে যায় পণ্যবাহী ট্রাক। ট্রাক না চললে টান পড়ে জ্বালানিতে। আর জ্বালানি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ালে পাম্পে লাইন বাড়ে, তৈরি হয় কৃত্রিম চাপ। তাই শিলংয়ের পেট্রল পাম্পের সেই দীর্ঘ লাইন শুধু তেলের জন্য অপেক্ষা নয়—অসম-মেঘালয় সংঘাত কতটা দ্রুত সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে যেতে পারে, তারও স্পষ্ট ছবি। এখন নজর, সীমান্তের অবরোধ কত দ্রুত উঠছে এবং অসম থেকে মেঘালয়ের জ্বালানি সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হচ্ছে।