আলিপুরদুয়ার: জঙ্গলে বাঘ ফেরার আগেই বাঘকে ঘিরে প্রস্তুতি শুরু আলিপুরদুয়ারে। তবে এ প্রস্তুতি শুধু বন দফতরের খাঁচা, নজরদারি ক্যামেরা কিংবা জঙ্গলের নিরাপত্তা ঘিরে নয়। এ বার প্রস্তুত করা হচ্ছে ‘বাঘ-বন্ধু’। স্কুলের পড়ুয়ারাই হয়ে উঠবে সেই দূত। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘ ফেরানোর আগে আলিপুরদুয়ার জেলার প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে তৈরি হবে ‘টাইগার ক্লাব’। লক্ষ্য একটাই— জঙ্গলে বাঘ ফিরলে মানুষ যেন তাকে ভয় বা আতঙ্কের চোখে না দেখে, আবার বাঘও যেন মানুষের চাপে বিপন্ন না হয়। দুই পক্ষের সহাবস্থানের সেই মানসিকতা তৈরি করতে স্কুলপড়ুয়াদের হাতিয়ার করছে বন দফতর।
বক্সায় বাঘ ফেরানোর পরিকল্পনা অবশ্য আচমকা নয়। ২০১৮ সাল থেকে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে বাঘ পুনরুদ্ধার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও নজরদারি চলছে। ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া এবং বন দফতরের গবেষণায় বাসস্থান, শিকারপ্রাণীর সংখ্যা, বাঘের উপস্থিতি এবং স্থানীয় মানুষের মনোভাব— সব দিকই খতিয়ে দেখা হয়েছে। ২০২৪ সালের গবেষণা-ফলাফলে বক্সার প্রায় ৩৯.৯ শতাংশ এলাকা বাঘের জন্য উপযুক্ত বলে চিহ্নিত হয়েছিল। একই সমীক্ষায় ৮৩ শতাংশের বেশি পরিবার বক্সায় বাঘ ফেরানোর পক্ষে মত জানিয়েছিল।
তবু বাঘ ফেরানো মানেই শুধু জঙ্গলে বাঘ ছেড়ে দেওয়া নয়। বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত বাসস্থান, শিকারপ্রাণীর উপস্থিতি, নজরদারি এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা— এই সবক’টি বিষয় একসঙ্গে কাজ না করলে পুনঃপ্রবর্তন প্রকল্প সফল হওয়া কঠিন। বক্সার ক্ষেত্রে সেই কারণেই সচেতনতার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিশেষজ্ঞ মহলেও তাড়াহুড়ো না করে বাসস্থান ও স্থানীয় পরিস্থিতি যথেষ্ট প্রস্তুত করার পরামর্শ এসেছে। এ বার সেই প্রস্তুতির অন্যতম মুখ স্কুলপড়ুয়ারা।
বন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ১৫-২০ জন পড়ুয়াকে নিয়ে গড়ে উঠবে ‘টাইগার ক্লাব’। বন দফতরের আধিকারিক এবং বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা ক্লাবের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেবেন। বাঘের স্বাভাবিক আচরণ, গতিবিধি, খাদ্যশৃঙ্খলে তার ভূমিকা, জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্র এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা— বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের ধারণা দেওয়া হবে।
শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, পরিস্থিতি সামলানোর শিক্ষাতেও জোর দেওয়া হবে। জঙ্গলের কাছাকাছি বাঘ দেখা গেলে কী করা উচিত, কী ভাবে বন দফতরকে খবর দিতে হবে, বাঘকে দেখতে পেয়ে ভিড় করলে কেন বিপদ বাড়তে পারে, তাকে উত্ত্যক্ত বা তাড়া করা কেন বিপজ্জনক— সেই বিষয়েও পড়ুয়াদের সচেতন করা হবে। উদ্দেশ্য, বাঘ সম্পর্কে গুজব বা আতঙ্কের বদলে তথ্যভিত্তিক ধারণা তৈরি করা।
তার পর সেই পড়ুয়ারাই হয়ে উঠবে সচেতনতার ‘চেন’। স্কুল থেকে পরিবার, পরিবার থেকে পাড়া— বাঘ সংরক্ষণের বার্তা পৌঁছে যাবে সমাজের আরও বড় অংশে। বন দফতরের ধারণা, শিশু-কিশোরদের মাধ্যমে তৈরি সচেতনতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ জঙ্গলের আশপাশের বহু পরিবারই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বন ও বন্যপ্রাণের সঙ্গে যুক্ত।
স্কুলের পাশাপাশি জঙ্গল লাগোয়া এলাকাতেও চলবে বড়সড় প্রচার অভিযান। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ভিতরে ও সংলগ্ন ৭৫টি গ্রাম, বনবস্তি এবং চা-বাগান এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২৫টি দল পর্যায়ক্রমে ওই এলাকাগুলিতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলবে। সাম্প্রতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৫ অগস্ট থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত এই প্রচার চালানোর কথা। সেখানে শুধু বাঘ নয়, জঙ্গল ও অন্যান্য বন্যপ্রাণ নিয়েও সচেতনতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে প্রতিদিন একাধিক গ্রামে পৌঁছবে প্রচারকারী দল। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে বাঘ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা হবে। বাঘ লোকালয়ে ঢুকলে কী করতে হবে, কোথায় ভিড় করা যাবে না, কী ভাবে দ্রুত বন দফতরকে জানাতে হবে— সেই ব্যবহারিক বিষয়গুলিও বোঝানো হবে। পরে বক্সা সংলগ্ন প্রায় ৩০টি চা-বাগান এলাকাতেও একই ধরনের কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাঘ ফেরানোর প্রস্তুতিতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণকে কেন এতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার উত্তর রয়েছে বক্সার অতীতেও। সরকারি নথি ও গবেষণায় উঠে এসেছে, বক্সায় মানুষের বসতি এবং মানবিক চাপ বাঘের স্থায়ীভাবে থাকার ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বক্সার সঙ্গে অসম ও ভুটানের বনাঞ্চলের সংযোগ থাকায় স্বাভাবিক ভাবেও বাঘের যাতায়াতের সম্ভাবনা রয়েছে। বাসস্থান ও শিকারভিত্তি উন্নত হলে সেই সংযোগ বাঘ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় বাঘ আনার জন্য বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভের নামও সামনে এসেছে। প্রথম দফায় একটি স্ত্রী-বাঘ আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। বাঘ স্থানান্তরের বিষয়ে আন্তঃরাজ্য সমন্বয়ের কাজও এগিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বন দফতরের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— বাঘ এল, তার পরে কী? কারণ জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোও ততটাই জরুরি। সেই কারণেই বাঘ আসার আগেই স্থানীয় সমাজকে প্রস্তুত করার চেষ্টা।
রাজ্যের বন ও পরিবেশ মন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাঁও বলেন, ‘‘বাঘকে বক্সায় এনে ছেড়ে দেওয়ার পরেই আসল কাজ শুরু হবে। তার আগে সাধারণ মানুষ এবং পড়ুয়াদের সচেতন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বাঘ ছেড়ে দিলেই হবে না। সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। বাঘের আচার-আচরণ, গতিপ্রকৃতি কী, সেটাও জানা দরকার। তাই সচেতনতার কাজে ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতা নেওয়া হবে।’’
আলিপুরদুয়ারের সমাজসেবী তথা শিক্ষক রাতুল বিশ্বাসের বক্তব্য, ‘টাইগার ক্লাব’ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে তাঁর মতে, এক-দু’দিনের অনুষ্ঠান নয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কর্মসূচির মাধ্যমে এই ক্লাবকে সক্রিয় রাখতে হবে। তবেই পড়ুয়াদের মধ্যে বন ও বন্যপ্রাণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরি হবে।
আলিপুরদুয়ারের ‘পিপলস ফর অ্যানিম্যালস’-এর সম্পাদক জয়দেব দে বলেন, বন দফতরের উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক। স্কুলের পড়ুয়াদের বাঘ সংরক্ষণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে আগামী দিনে তারাই সাধারণ মানুষের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে পারবে। তাঁর মতে, বাঘ সংরক্ষণকে শুধুমাত্র বন দফতরের কাজ না রেখে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।
পরিবেশপ্রেমী নন্দু রায়ের কথায়, ‘‘বাঘের আচরণ সম্পর্কে আমরা যত ভাল জানব, ততই সজাগ থাকতে পারব। বাঘ সংরক্ষণে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা সচেতন হলেই পরিবার এবং সমাজকে সচেতন করতে পারবে।’’
বক্সার জঙ্গলে বাঘ ফেরানোর দিন যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে— এই প্রকল্পের সাফল্য শুধু বাঘের গর্জনে মাপা যাবে না। মাপা হবে জঙ্গলের পাশে থাকা মানুষের মনোভাবেও। বাঘের জন্য জঙ্গল প্রস্তুত করার পাশাপাশি তাই মানুষকেও প্রস্তুত করছে বন দফতর। আর সেই প্রস্তুতির প্রথম সারিতে এ বার বনকর্মী নয়, বন্দুক নয়— স্কুলের পড়ুয়ারা। বক্সায় বাঘ ফেরার আগে তৈরি হচ্ছে এক নতুন প্রজন্মের ‘বাঘ-বন্ধু’।