চেরনোবিল: যে চেরনোবিলের নাম শুনলেই মনে পড়ে ভয়াবহ পরমাণু দুর্ঘটনা, জনশূন্য শহর আর তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্ক, সেই এলাকাতেই নতুন করে বংশবিস্তার করছে বিরল প্রজাতির বন্য ঘোড়া। ১৯৯৮ সালে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়া। শুরুর দিকে মৃত্যু ও চোরাশিকারের ধাক্কা সামলাতে হলেও, ২০১৮ সালে গবেষকেরা ইউক্রেনের চেরনোবিলের বর্জন-অঞ্চলে ১৩৭টি ঘোড়ার সন্ধান পান। মানুষের বসতি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এই ভূখণ্ডে কী ভাবে টিকে গেল তারা?
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ইউক্রেনের তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত চেরনোবিল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম গুরুতর এই পরমাণু বিপর্যয়ের পর বিপুল এলাকা তেজস্ক্রিয় দূষণের শিকার হয়। নিরাপত্তার কারণে আশপাশের শহর ও গ্রাম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বাসিন্দাদের। পরবর্তী সময়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল মানুষের স্বাভাবিক বসবাসের বাইরে চলে যায়।
কিন্তু মানুষের অনুপস্থিতিতে ওই অঞ্চলের প্রকৃতিতে তৈরি হয় নতুন পরিস্থিতি। পরিত্যক্ত বাড়িঘর, ফাঁকা রাস্তা, ঘন হয়ে ওঠা বনভূমি আর বিস্তীর্ণ তৃণভূমির মধ্যে বন্য প্রাণীদের বিচরণ বাড়তে থাকে। এই পরিবেশেই বিরল প্রজাতির প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়ার জন্য নতুন আবাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯৮ সালে সংরক্ষণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঘোড়াগুলিকে চেরনোবিলের বর্জন-অঞ্চলে নিয়ে আসা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, প্রকৃতিতে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই বন্য প্রজাতির একটি স্বাধীন ও প্রজননক্ষম জনসংখ্যা গড়ে তোলা।
৩১টি ঘোড়া থেকে ১৩৭, কী ভাবে বাড়ল সংখ্যা?
প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়া মধ্য এশিয়ার তৃণভূমির বাসিন্দা। এক সময় প্রাকৃতিক পরিবেশে এই প্রজাতির অস্তিত্ব কার্যত বিলুপ্তির মুখে পৌঁছে গিয়েছিল। বন্দি অবস্থায় প্রজনন এবং সংরক্ষণ কর্মসূচির সাহায্যে তাদের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়। সেই উদ্যোগেরই একটি অংশ ছিল চেরনোবিলে ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া।
প্রাথমিক পর্যায় অবশ্য খুব সহজ ছিল না। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা, ঘোড়ার মৃত্যু এবং চোরাশিকারের মতো ঘটনা তাদের টিকে থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে তারা বংশবিস্তার করতে শুরু করে।
২০১৮ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপের সাহায্যে গবেষকেরা ইউক্রেনের চেরনোবিল বর্জন-অঞ্চলে মোট ১৩৭টি প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়ার সন্ধান পান। এই সংখ্যার মধ্যে ছিল ৪৭টি পুরুষ ঘোড়া, ৬৬টি স্ত্রী ঘোড়া এবং ২৪টি শাবক।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে ঘোড়ার সংখ্যা প্রায় সাত গুণ বেড়েছে। তবে ২০১৮ সালের হিসাবকে বর্তমান জনসংখ্যা বলে ধরে নেওয়া যাবে না। এটি ওই সময়ে পরিচালিত সমীক্ষার ফল।
জঙ্গলে শুধু বিচরণ নয়, পরিত্যক্ত বাড়িতেও আশ্রয়
প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়ার জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণায় উঠে এসেছে আরও একটি আকর্ষণীয় তথ্য। চেরনোবিলের ঘোড়াগুলি শুধু খোলা তৃণভূমিতে ঘোরাফেরা করে না, বনাঞ্চলেও তাদের দেখা যায়। এমনকি পরিত্যক্ত বাড়ি ও পুরনো ভবনের ভিতরেও আশ্রয় নিতে দেখা গিয়েছে তাদের।
শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে কিংবা গরমকালে পোকামাকড়ের উপদ্রব এড়াতে ভাঙাচোরা বাড়িঘর তাদের কাজে লাগে। মানুষের ফেলে যাওয়া স্থাপত্য তাই এই বন্য প্রাণীদের কাছে কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
গবেষকদের মতে, এই ঘোড়াদের পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে ঘন হয়ে ওঠা বনভূমি একটি বড় সমস্যা। গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাণীদের সরাসরি চোখে দেখা কঠিন। তাই ক্যামেরা ট্র্যাপের সাহায্যে তাদের সংখ্যা ও চলাফেরা সম্পর্কে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
২০১৮ সালের সমীক্ষায় চেরনোবিলের মোট ২,৬০০ বর্গকিলোমিটার বর্জন-অঞ্চলের মধ্যে প্রায় ৭২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পরীক্ষা করা হয়েছিল। ফলে ওই সমীক্ষায় পাওয়া সংখ্যার চেয়েও বাস্তবে ঘোড়ার সংখ্যা বেশি হয়ে থাকতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন।
তেজস্ক্রিয়তার মধ্যেও কি নিরাপদে রয়েছে ঘোড়াগুলি?
এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। ঘোড়ার সংখ্যা বাড়ছে বলেই কি প্রমাণিত হয় যে চেরনোবিলের পরিবেশ সম্পূর্ণ নিরাপদ? উত্তর হল, না।
কোনও প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া তার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তেজস্ক্রিয় দূষণের কোনও প্রভাব নেই। প্রাণীদের শরীর, প্রজননক্ষমতা, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের উপর বিকিরণের প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চেরনোবিলের বর্জন-অঞ্চলে মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় শিকার, কৃষিকাজ, যানবাহন এবং নগরায়ণের মতো বিভিন্ন মানবসৃষ্ট চাপও কমেছে। ফলে বন্য প্রাণীদের জন্য কিছু এলাকায় তুলনামূলক অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে তেজস্ক্রিয় দূষণ যে ঝুঁকি তৈরি করে, তা এই পরিবর্তনের ফলে অদৃশ্য হয়ে যায়নি। অর্থাৎ, ঘোড়াগুলির বংশবিস্তার প্রকৃতির অভিযোজন ক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলেও, সেটিকে তেজস্ক্রিয়তার নিরাপত্তার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
প্রকৃতি কি মানুষের অনুপস্থিতিতে নিজেকে ফিরে পায়?
চেরনোবিলের গল্পে রয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। এক দিকে, মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠা একটি ভূখণ্ড। অন্য দিকে, সেই ভূখণ্ডেই বন্য প্রাণীদের নতুন করে বসতি গড়ে তোলা।
প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি দেখিয়েছে, উপযুক্ত পরিস্থিতি পেলে সংরক্ষিত প্রাণীরা নতুন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং বংশবিস্তার করতে পারে। তবে এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কর্মসূচি, প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ এবং মানুষের হস্তক্ষেপ সীমিত থাকার মতো একাধিক কারণ।
চেরনোবিল তাই শুধু পরমাণু দুর্ঘটনার স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চল নয়, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের সম্পর্ক বোঝারও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। মানুষের তৈরি বিপর্যয়ের পরেও প্রকৃতি কী ভাবে নতুন ভারসাম্য খুঁজে নিতে পারে, প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়ার গল্প তারই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
তবে প্রকৃতির এই প্রত্যাবর্তনকে বিপর্যয়ের ক্ষত মুছে যাওয়া বলে ভুল করলে চলবে না। চেরনোবিলের ঘোড়াগুলি টিকে থাকার গল্প শোনায়, কিন্তু একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়—পরমাণু দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে বিজ্ঞানীদের গবেষণা এখনও অত্যন্ত জরুরি।




