বেজিং: ৩৫ তলার উপর থেকে পড়ে যাওয়ার পরেও বেঁচে ফেরা! তবে সেই বেঁচে থাকার মূল্যও কম নয়। গুরুতর আঘাতে বাদ দিতে হয়েছে ডান পা। দীর্ঘ চিকিৎসা, অসহ্য যন্ত্রণা আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে প্রায় ১৭ মাস পরে ফের সমাজমাধ্যমে ফিরলেন চিনের ২৭ বছরের ইনফ্লুয়েন্সার ওয়ান আনআন। তাঁর অনলাইন পরিচিতি ‘ওয়ানানান’। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় নিজের দুর্ঘটনা ও দীর্ঘ পুনর্বাসনের কথা তুলে ধরে তিনি জানিয়েছেন, জীবনের কঠিনতম সময় পেরিয়ে ফের নতুন করে বাঁচতে শিখছেন।
২০২৫ সালের ১০ জুন ভোরে চিনের হুনান প্রদেশের চাংশা শহরে একটি আবাসনের ৩৫ তলা থেকে পড়ে যান ওয়ান। কী ভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের তরফে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর শরীরে একাধিক গুরুতর আঘাত ছিল। মাথায় চোট, ঘাড়ের হাড়ে ক্ষতি, পাঁজর ও শ্রোণিতে একাধিক হাড় ভাঙা এবং শরীরের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গের আঘাতের মতো জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় চিকিৎসকদের।
চিকিৎসকদের একটি বড় দল প্রায় ১৪ ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার করেন। তার পরে ওয়ানকে রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বা আইসিইউতে। সেখানে ৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলে চিকিৎসা। এই সময়ের মধ্যে তাঁকে একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয় তাঁর শারীরিক অবস্থা। কিন্তু প্রাণে বেঁচে ফিরলেও দুর্ঘটনার ক্ষত ছিল গভীর। ডান পায়ের গুরুতর আঘাতের কারণে শেষ পর্যন্ত তা বাদ দিতে হয়। জ্ঞান ফেরার পরেও অপেক্ষা করছিল কঠিন বাস্তব। ওয়ানের স্মৃতির কিছু অংশ হারিয়ে গিয়েছিল, স্বাভাবিক ভাবে কথা বলা ও যোগাযোগ করতেও সমস্যা হচ্ছিল। দীর্ঘ দিন শয্যাশায়ী থাকার ফলে পেশির শক্তি কমে যায়। এমনকি বিছানায় পাশ ফিরতেও অন্যের সাহায্য নিতে হত তাঁকে।
আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত হওয়ার পর যন্ত্রণার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ব্যথা কমানোর ওষুধ এবং ঘুমের ওষুধের মাত্রা কমানো হলে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকেন তিনি। ওয়ানের কথায়, আইসিইউ থেকে বেরোনোর পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় সব মিলিয়ে তিন ঘণ্টারও কম ঘুম হয়েছিল তাঁর। শরীরে নল লাগানো, অস্ত্রোপচারের ক্ষত এবং নড়াচড়ার অসুবিধা, সব মিলিয়ে দিন কাটানোই কঠিন হয়ে উঠেছিল। কখনও কখনও হাল ছেড়ে দেওয়ার কথাও মনে হয়েছিল তাঁর।
তবে সেই অন্ধকার সময়েও লড়াই থামাননি ওয়ান। ধীরে ধীরে সুস্থ হওয়ার পথে এগিয়েছেন, নতুন শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখন তিনি হুইলচেয়ারে বাইরে যেতে পারেন। আগামী দিনে কৃত্রিম পা লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। চিকিৎসকদের বক্তব্য, ডান পা বাদ দেওয়া ছাড়া তাঁর অন্যান্য অঙ্গের কার্যক্ষমতা অনেকটাই ফিরে এসেছে।
এই ঘটনায় ওয়ানের বেঁচে ফেরার পিছনে চিকিৎসার পাশাপাশি দুর্ঘটনাস্থলের গাছপালারও ভূমিকা ছিল বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের ব্যাখ্যা, পড়ে যাওয়ার সময় নীচে থাকা একটি বড় গাছের ডাল এবং তার পরে ঝোপঝাড়ে আঘাত লাগায় পতনের অভিঘাত কিছুটা কমে থাকতে পারে। সেই ধাক্কা সামলানোর সুযোগই হয়তো তাঁকে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দিয়েছিল। তবে এটিকে নিশ্চিত একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না চিকিৎসকেরা। দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরে ১২ অক্টোবর সমাজমাধ্যমে ফিরে আসার ভিডিয়ো প্রকাশ করেন ওয়ান। সেখানে তিনি জানান, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা বদলে দিয়েছে। আগে কাজকর্ম ও দৈনন্দিন নানা বিষয় নিয়ে উদ্বেগে থাকতেন। এখন যা হারিয়েছেন, শুধু তার দিকে না তাকিয়ে যা এখনও রয়েছে, তার মূল্য বুঝতে চান তিনি। তাঁর কথায়, সুখের অর্থ যা নেই, তা নিয়ে আক্ষেপ করে যাওয়া নয়; বরং যা আছে, তাকে চিনতে শেখা।
ওয়ানের এই ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সমাজমাধ্যমে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বহু মানুষ। কেউ তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছেন, কেউ আবার দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লড়াইয়ে পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। তাঁর অনলাইন অ্যাকাউন্টে অনুসরণকারীর সংখ্যাও বেড়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর। তবে ওয়ানের কাছে এই প্রত্যাবর্তন শুধু ক্যামেরার সামনে ফিরে আসা নয়। দুর্ঘটনার পরে বদলে যাওয়া শরীর, হারানো স্মৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের নতুন বাধাগুলির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই এখন তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসক, পরিবার ও পাশে থাকা মানুষদের সাহায্যে ধীরে ধীরে সেই পথেই এগোচ্ছেন তিনি।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে ওয়ানের উপলব্ধি, জীবনে যা হারিয়ে যায়, তার জন্য শোক থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই শোকের মধ্যেই আটকে থাকলে সামনে এগোনো যায় না। তাই নতুন করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ৩৫ তলা থেকে পড়ে বেঁচে ফেরার ঘটনাটি যেমন তাঁকে ঘিরে বিস্ময় তৈরি করেছে, তেমনই দীর্ঘ পুনর্বাসনের লড়াই মনে করিয়ে দিয়েছে—বেঁচে ফেরা শুধু চিকিৎসার সাফল্য নয়, জীবনের সঙ্গে আবার মানিয়ে নেওয়ারও এক কঠিন প্রক্রিয়া।




