আকাশের নীলিমায় তখনও শরতের মায়া লেগে আছে। কাশবনের বুক ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে বিষণ্ণ বাতাস, শিউলির শুভ্র পাপড়িতে জমে আছে ভোরের শিশির। ঢাকের আওয়াজ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে, ধূপের ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে নীল আকাশের অসীমতায়। চারদিকে এক অদ্ভুত শূন্যতা, যেন আনন্দের রঙিন দিনগুলির শেষে প্রকৃতি নিজেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে বিদায়ের দুয়ারে। মা দুর্গা ফিরে চলেছেন কৈলাসে। উমার বিদায়ে মন ভারাক্রান্ত, চোখের কোণে জল, অথচ সেই অশ্রুর গভীরেই লুকিয়ে রয়েছে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি।
কিন্তু সত্যিই কি বিজয়া কেবল বিদায়ের নাম? নাকি বিদায়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে জীবনের আরও গভীর কোনও উপলব্ধি?
বিজয়া আমাদের শেখায়, যা চোখের সামনে থেকে সরে যায়, তা সব সময় হারিয়ে যায় না। কিছু উপস্থিতি দৃশ্যের সীমানা পেরিয়ে অনুভবের গভীরে স্থায়ী হয়ে থাকে। মাটির প্রতিমা বিসর্জিত হয় জলে, কিন্তু যে শক্তির আরাধনায় আমরা মাথা নত করি, সেই শক্তি তো থেকে যায় আমাদের বিশ্বাসে, বিবেকে, ভালোবাসায় এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট মানবিক আচরণে। মায়ের দশটি হাত যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের প্রতিটি সংকটের মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমাদের মধ্যেও রয়েছে সাহস, ধৈর্য ও প্রতিরোধের ক্ষমতা। মহিষাসুরের পরাজয় তাই কেবল পৌরাণিক এক যুদ্ধের সমাপ্তি নয়; তা মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অহংকার, হিংসা, লোভ, অন্যায় ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক।
প্রতিবছর মা আসেন, কয়েকটি দিন আমাদের জীবনকে উৎসবের রঙে রাঙিয়ে আবার ফিরে যান। তাঁর এই আসা-যাওয়ার মধ্যেই যেন জীবনের এক চিরন্তন সত্য লুকিয়ে আছে,পৃথিবীতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়, অথচ কিছু অনুভূতির কোনও অবসান নেই। সময় বদলায়, মানুষ দূরে সরে যায়, সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টায়, পরিচিত পথও কখনও অচেনা হয়ে ওঠে। তবু যে ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, যে মমতা প্রত্যাশাহীন, যে স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে শিকড় ছড়ায়, তাকে কোনও বিসর্জনের জল মুছে দিতে পারে না।
বিজয়ার প্রণাম তাই কেবল বড়দের পায়ে হাত রেখে আশীর্বাদ নেওয়া নয়; এটি নিজের অহংকারকে একটু নত করা, ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, জমে থাকা অভিমানকে ভালোবাসার কাছে সমর্পণ করা। সিঁদুরের রঙে, মিষ্টিমুখের আনন্দে, কোলাকুলির উষ্ণতায় আমরা যেন নতুন করে শিখি, মানুষের কাছে মানুষের চেয়ে বড় কোনও আশ্রয় নেই। যে সম্পর্ক একটুখানি কথায় ভেঙে যেতে পারত, তা হয়তো একটি আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থনায় আবার জুড়ে যেতে পারে। যে মানুষটি দীর্ঘদিন অভিমানের আড়ালে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে একবার কাছে টেনে নেওয়ার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে থাকে বিজয়ার প্রকৃত সার্থকতা।
কারণ, বিজয় মানে শুধু শত্রুকে পরাজিত করা নয়; নিজের ভিতরের অন্ধকারকে চিনে নিয়ে তার উপর আলোর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
আমাদের চারপাশে আজও কত অদৃশ্য অসুর, কারও জীবনে দারিদ্র্য, কারও মনে একাকিত্ব, কোথাও অবিচার, কোথাও বিদ্বেষ, কোথাও মানুষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস। প্রতিমার সামনে অঞ্জলি দেওয়া সহজ, কিন্তু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বিশ্বাসের প্রকৃত পরীক্ষা। দেবীর চরণে ফুল দেওয়া সহজ, কিন্তু বিপন্ন মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দেওয়া অনেক বেশি অর্থবহ। যদি বিজয়ার পরেও আমরা কারও প্রতি ঘৃণা পুষে রাখি, দুর্বলের আর্তি উপেক্ষা করি, কিংবা নিজের স্বার্থের কাছে মানবিকতাকে বিসর্জন দিই, তবে উৎসবের আলো আমাদের অন্তর পর্যন্ত পৌঁছল কোথায়?
আসুন, এই বিজয়ায় আমরা শুধু প্রতিমাকে বিদায় না জানাই; বিদায় জানাই মনের সংকীর্ণতাকে, অহংকারকে, পরশ্রীকাতরতাকে এবং সমস্ত অমানবিকতাকে। নতুন করে শপথ নিই, মানুষের পাশে মানুষের মতো দাঁড়ানোর, ভিন্নতার মধ্যেও সৌহার্দ্য খুঁজে নেওয়ার, অন্ধকার সময়েও আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার।
মা দুর্গা কৈলাসে ফিরে যান, কিন্তু তাঁর আশীর্বাদ যেন আমাদের প্রতিদিনের কাজে বেঁচে থাকে। তাঁর শক্তি হয়ে উঠুক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস, তাঁর করুণা হয়ে উঠুক অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা, তাঁর শান্তি হয়ে উঠুক অস্থির পৃথিবীতে ভালোবাসার আশ্রয়।
শরৎ একদিন বিদায় নেবে, শিউলি ঝরে যাবে, কাশফুলের সাদা ঢেউ মিলিয়ে যাবে ঋতুচক্রের নিয়মে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যদি মমতার বসন্ত জেগে থাকে, তবে কোনও বিদায়ই চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হয়ে উঠতে পারে না।
বিজয়া তাই শেষের নাম নয়, ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। বিসর্জন তাই হারানোর গল্প নয়, হৃদয়ে ধারণ করার সাধনা। আর শুভ বিজয়া মানে পৃথিবীকে একটু বেশি ভালোবাসার, মানুষকে একটু বেশি আপন করে নেওয়ার এবং নিজের ভিতরের দেবীত্বকে জাগিয়ে তোলার এক পবিত্র অঙ্গীকার।
মায়ের আশীর্বাদে প্রতিটি হৃদয়ে জাগুক শুভবোধ, প্রতিটি সম্পর্কে ফিরুক মাধুর্য, প্রতিটি জীবনে ফুটে উঠুক আশার নতুন শিউলি। অশুভের অবসান হোক, শুভের জয় হোক, মানবতার আলোয় আলোকিত হোক আমাদের আগামী।
শুভ বিজয়া





