কলকাতা: সপ্তমীর সন্ধ্যায় দুর্গাপুজোর আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয়েছিল ভয়াবহ বিপর্যয়ে। উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্কের চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকস্তব্ধ গোটা রাজ্য। আহত হয়েছেন ২৫ জনেরও বেশি মানুষ। কীভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা? কেন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেল না? এবার সেই ভয়াবহ সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন প্রত্যক্ষদর্শী অনিন্দ্যকুমার দাস। তাঁর বয়ানে উঠে এসেছে প্রবল বৃষ্টি, সরু রাস্তা, অতিরিক্ত ভিড় এবং চরম বিশৃঙ্খলার ছবি।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মণ্ডপে ঢুকেছিলেন দর্শনার্থীরা?
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোন্নগরের বাসিন্দা অনিন্দ্যকুমার দাস বিকেলেই পরিবারের সঙ্গে চোরবাগানের পুজো দেখতে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মেয়ে ও নাতনি। পুজোর মণ্ডপের আকর্ষণ এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ের খবর পেয়েই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই আনন্দের সফর যে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, মণ্ডপে ঢোকার জন্য একটি সরু রাস্তা দিয়ে এগোতে হয়েছিল। সেখানে একটি নির্মীয়মাণ বাড়ির কারণে জায়গাটি আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য। প্রবেশের সময় উদ্যোক্তাদের VIP লাইনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখেছিলেন বলেও জানান তিনি।
মণ্ডপের ভিতরে ছিল বৃত্তাকার একটি ‘এলিভেটেড করিডর’, যেখান দিয়ে ঘুরে দর্শনার্থীদের বেরিয়ে আসতে হচ্ছিল। বাইরে তখন জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একসঙ্গে বহু মানুষ মণ্ডপের ভিতরে ঢুকে পড়েন। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
‘হেল্প, হেল্প’ চিৎকার, তবু চারদিকে বিশৃঙ্খলা!
অনিন্দ্যবাবুর বর্ণনা অনুযায়ী, আচমকাই শুরু হয় তুমুল হুড়োহুড়ি। ভিড়ের চাপে মানুষ একে অপরের উপর পড়তে থাকেন। নিজের মেয়ে ও নাতনিকে কোনওরকমে হাত ধরে আগলে রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে নিজেকেই সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ, সেই সময় তিনি আশপাশে পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবকদের দেখতে পাননি। সাহায্যের জন্য চিৎকার করেও পরিস্থিতি সামলানোর মতো কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না বলে দাবি তাঁর। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাকে মণ্ডপের অংশ ভেঙে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে দেখেন বলেও জানান তিনি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
ঘটনার পর মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও প্রস্থানের রাস্তা, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং পুলিশি নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগের ভিত্তিতে উঠে এসেছে; সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয়ের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।
সপ্তমীর আনন্দে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেন হল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছেন বহু মানুষ। চোরবাগানের এই ঘটনা বড় পুজো মণ্ডপগুলিতে নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনা করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।





