কলকাতা: চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকস্তব্ধ পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করতে মঙ্গলবার জেলায় জেলায় ঘুরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া এবং নদিয়ায় গিয়ে নিহতদের পরিজনদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তাঁদের হাতে তুলে দেন ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্যের চেক। পাশাপাশি, প্রতিটি নিহতের পরিবারের এক জনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তদন্ত এবং দায় নির্ধারণ নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার দুপুরে প্রথমে পূর্ব বর্ধমানের বীরপুরে যান শুভেন্দু। কলকাতায় ঠাকুর দেখতে এসে চোরবাগানের বিপর্যয়ে প্রাণ হারিয়েছেন টগর বেজ এবং তাঁর ১৪ বছরের ছেলে সন্দীপ বেজ। স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়ে কার্যত দিশাহারা সঞ্জয় বেজের সঙ্গে প্রায় ১৫ মিনিট কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় দু’জনের জন্য মোট ৫০ লক্ষ টাকার চেক—প্রত্যেকের মৃত্যুর জন্য ২৫ লক্ষ টাকা করে। পরিবারের এক জনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
স্ত্রী ও সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণা যে কোনও আর্থিক সাহায্যে পূরণ হওয়ার নয়, তা মেনে নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীর এই উদ্যোগে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সঞ্জয়।
তাঁর কথায়, পুজোয় ঠাকুর দেখতে গিয়ে স্ত্রী ও ছেলেকে হারাতে হয়েছে। এমন সময়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজে বাড়িতে এসে দেখা করবেন, সান্ত্বনা দেবেন, তা তিনি ভাবতে পারেননি। পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস পেয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। এর পরে হুগলির আরামবাগের বালিয়া গ্রামে যান শুভেন্দু। চোরবাগানের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন পিয়ালি প্রামাণিক। তিনি টগর বেজের আত্মীয় ছিলেন এবং একই সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন। পিয়ালির পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। শোকাহত আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাসও দেন তিনি।
হাওড়ার লিলুয়ার আনন্দনগর বিদ্যাসাগর পল্লিতে আকৃতি রাউতের পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন শুভেন্দু। চোরবাগানের পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আকৃতি। তাঁর পরিবারের হাতেও ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্য তুলে দেওয়া হয়। একই ভাবে চাকদহের বাসিন্দা আরতি সরকারের বাড়িতে গিয়েও তাঁর পরিজনদের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। একের পর এক বাড়িতে গিয়ে শোকাহত পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করার মাধ্যমে বিপর্যয়ের অভিঘাত কতটা গভীর, তা সামনে এসেছে।
বৈদ্যবাটীতে শ্রীপর্ণা পোদ্দারের বাড়িতেও যান শুভেন্দু। ২৭ বছরের শ্রীপর্ণা ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান।
রাজারহাটের একটি ক্যানসার হাসপাতালে কাজ করতেন তিনি। তাঁর বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। শ্রীপর্ণার মাকে ফের নার্সের কাজে যুক্ত করার জন্য স্থানীয় বিধায়ককে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন তিনি। পাশাপাশি, শ্রীপর্ণার বাবা-মা দু’জনেরই বার্ধক্য ভাতা চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলাশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শ্রীপর্ণার মা স্বপ্না পোদ্দার জানিয়েছেন, তাঁদের ক্ষতি অপূরণীয়। তবু এই কঠিন সময়ে মুখ্যমন্ত্রী পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সাধ্য অনুযায়ী সাহায্যের চেষ্টা করেছেন বলে তাঁরা মনে করছেন। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে এই আশ্বাস কিছুটা হলেও তাঁদের ভরসা জোগাচ্ছে।
নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পরে শুভেন্দু বলেন, যাঁরা চলে গিয়েছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু তার পরেও যে দায়িত্ব থেকে যায়, তা পালন করা সরকারের কর্তব্য। চোরবাগানের ঘটনায় যাঁদের ঘরে শোক নেমে এসেছে, তাঁদের দুঃখকে নিজের সরকারের দুঃখ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এই বিপর্যয়ের পরে আনন্দ-অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তবে শোকপ্রকাশ ও আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কও এড়াননি শুভেন্দু। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কলকাতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু এবং দার্জিলিঙের নাগরাকাটায় হড়পা বানের মতো ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অতীতে এমন বিপর্যয়ের পরেও উৎসবের নানা অনুষ্ঠান হয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের ভূমিকার সঙ্গে আগের সরকারের কাজের তুলনা মানুষ নিজেরাই করতে পারবেন।
চোরবাগান-কাণ্ডের তদন্ত নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিচারপতির মনোনয়ন চেয়ে চিঠি পাঠানো হবে। তদন্তে কলকাতা পুলিশ বা কলকাতা পুরসভার প্রতিনিধিদের রাখা হবে না, যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। পুলিশের ভূমিকা, পুজো উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। গাফিলতি প্রমাণিত হলে কাউকেই রেয়াত করা হবে না—এই বার্তাও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চোরবাগানের বিপর্যয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা এবং ঘোষণার জেরে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ—সব দিকই এখন তদন্তের আওতায়। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য ও চাকরির আশ্বাস দেওয়া সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। কিন্তু তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় ক্ষতি প্রিয়জনকে হারানো। ২৫ লক্ষ টাকার চেক কিংবা চাকরির প্রতিশ্রুতি সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। এখন পরিবারগুলির প্রত্যাশা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, দায়ীদের চিহ্নিত করা হোক এবং ভবিষ্যতে কোনও পুজো মণ্ডপে এমন বিপর্যয় আর না ঘটে, তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।





