নিউজ ডেস্ক: কড়া নিরাপত্তা বলয়, সাইরেনের আওয়াজ আর প্রশাসনিক ব্যস্ততা চেনা এই আবহেই তখন গমগম করছে চত্বর। প্রশাসনিক কর্তাদের ব্যস্ত আনাগোনার ফাঁকে গেটের একপাশে ভিড়ের আড়ালে শান্তভাবে দাঁড়িয়েছিলেন এক বৃদ্ধ। বয়স নব্বই ছুঁয়েছে। চামড়া কুঁচকে যাওয়া শরীরে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক টান। জীর্ণ দুই হাতের মুঠোয় পরম যত্নে আঁকড়ে ধরেছিলেন একটি লাল কাপড়ে মোড়া পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। উদ্দেশ্য একটাই দূর থেকে নয়, নিজের হাতে এই গ্রন্থটি তুলে দিতে চান রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের হাতে।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটে এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে। কনভয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রীর নজর চলে যায় গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অশীতিপর বৃদ্ধের দিকে। কড়া নিরাপত্তার গণ্ডি অগ্রাহ্য করেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ান তিনি। প্রবীণ মানুষটিকে সেখানে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর পা বাড়াননি গাড়ির দিকে, সটান এগিয়ে যান তাঁরই পানে।
মুখ্যমন্ত্রীকে একেবারে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারেননি নব্বই বছরের বৃদ্ধ। কাঁপা কাঁপা হাতে সযত্নে ধরা গীতাটি তিনি বাড়িয়ে দেন প্রিয় নেতার দিকে। কোনওরকম দ্বিধা না রেখে পরম শ্রদ্ধায় সেই উপহার গ্রহণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এভাবে হঠাৎ বাস্তব হয়ে ধরা দেওয়ায় নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি বৃদ্ধ। কথা হারিয়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু তাঁর চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা আনন্দাশ্রু বুঝিয়ে দিচ্ছিল মনের ভেতরের গভীর তৃপ্তি।
চোখের জলের এই ভাষাকে উপেক্ষা করেননি মুখ্যমন্ত্রীও। বৃদ্ধের মাথায় হাত রেখে তাঁর কুশল সংবাদ নেন এবং অত্যন্ত বিনম্র সুরে বলেন, “ভালো থাকুন, আশীর্বাদ করুন।” এক রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের এমন অপ্রত্যাশিত স্নেহ ও বিনম্র আচরণে উপস্থিত সকলেই একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান।
রাজনীতি কিংবা প্রশাসনিক কাজকর্মের বাইরে গিয়ে এই ধরণের মুহূর্তগুলিই সাধারণ মানুষের সঙ্গে নেতৃত্বের এক অদৃশ্য আত্মিক যোগ তৈরি করে। যে বয়সে মানুষ ঘরের বাইরে বেরোতেই দশবার ভাবেন, সেই বয়সে শুধুমাত্র নিজের হাতে প্রিয় মানুষটির হাতে একটি ধর্মগ্রন্থ তুলে দিতে ছুটে এসেছিলেন এই প্রবীণ নাগরিক।
দিনশেষে ফিরে যাওয়ার সময় বৃদ্ধের মুখে আর ক্লান্তির কোনও ছাপ ছিল না। হাতে গীতা না থাকলেও, তাঁর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে ছিল এক অনাবিল প্রশান্তি। ভিড়ভাট্টা আর সুরক্ষাবেষ্টনী পেরিয়ে এই সামান্য সাক্ষাৎ যেন তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হয়ে রইল।




