মুম্বই: সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অফিস। তার পর বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নয়, শুরু হত দ্বিতীয় কাজ। কখনও ভিডিয়ো শুটিং, কখনও সম্পাদনা। কাজ শেষ করতে রাত গড়িয়ে ভোর ৪টে। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে ফের সকাল ৮টায় অফিসের পথে। এ ভাবেই কর্পোরেট চাকরির পাশাপাশি নিজের কনটেন্ট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন শুভ সারাং। এখন সেই চাকরিই ছেড়েছেন তিনি। সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো তৈরি করে মাসে আয় করছেন ২ লক্ষ ২০ হাজার থেকে আড়াই লক্ষ টাকা! তাঁর দাবি, এই আয়ের ফলে মাসের শেষে ঋণের কিস্তি বা ইএমআই মেটানো নিয়ে দুশ্চিন্তাও অনেকটা কমেছে।
চাকরির নিশ্চিন্ত বেতন ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না শুভর পক্ষে। কারণ, প্রতি মাসে নির্দিষ্ট আয় বন্ধ হয়ে গেলে সংসারের খরচ এবং ঋণের কিস্তি কী ভাবে মেটাবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল তাঁরও। কিন্তু সমাজমাধ্যমে তাঁর তৈরি ভিডিয়ো জনপ্রিয় হতে শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। একসময় কনটেন্ট তৈরির কাজ থেকে আয় তাঁর কর্পোরেট চাকরির বেতনের তিন থেকে চার গুণ হয়ে যায়। তার পরেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
প্রথম ব্র্যান্ডের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা
শুভর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি ব্র্যান্ডের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক। ইনস্টাগ্রামে একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে প্রথম বার এক লক্ষ টাকা পান তিনি। সেই টাকা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। বুঝতে পারেন, সমাজমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করেও নিয়মিত আয়ের সুযোগ রয়েছে। শুভ জানিয়েছেন, প্রথম দিকে ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ হাজারের কাছাকাছি। তখন তিনি আর পাঁচ জন সাধারণ কনটেন্ট নির্মাতার মতোই ভিডিয়ো তৈরি করতেন। কিন্তু আচমকাই তাঁর কনটেন্ট মানুষের নজর কাড়তে শুরু করে। মাত্র এক থেকে দু’মাসের মধ্যে অনুগামীর সংখ্যা বেড়ে এক লক্ষে পৌঁছে যায়।
এর পর আরও একটি ভিডিয়ো তাঁকে প্রায় দু’লক্ষ অনুগামীর কাছে পৌঁছে দেয়। বাড়তে থাকে জনপ্রিয়তা। একের পর এক ব্র্যান্ডের কাছ থেকে আসতে শুরু করে কাজের প্রস্তাব। শুভর দাবি, একটি ভিডিয়ো তৈরির জন্য কোনও কোনও ব্র্যান্ড তাঁকে ১ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি হয়েছিল। সেখান থেকেই তৈরি হয় আয়ের নতুন পথ। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে ব্র্যান্ডের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে মাসে ২ লক্ষ ২০ হাজার থেকে আড়াই লক্ষ টাকা আয় করছেন বলে জানিয়েছেন শুভ।
অফিসের কাজের পর রাত জেগে ভিডিয়ো
কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে সাফল্য এলেও প্রথম দিকে চাকরি ছাড়ার সাহস পাননি শুভ। কারণ, সমাজমাধ্যমের আয় কত দিন থাকবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল। নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিতে প্রতি মাসে টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু কনটেন্ট তৈরির কাজের ক্ষেত্রে সেই নিশ্চয়তা নেই। তাই কর্পোরেট চাকরির পাশাপাশি ভিডিয়ো তৈরি চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। দিনের বেলা অফিসে কাজ করতেন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বাড়ি ফিরে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন ভিডিয়ো শুট করতে। তার পর শুরু হত সম্পাদনার কাজ।
শুভ জানিয়েছেন, অনেক দিন রাত ৪টে পর্যন্ত ভিডিয়ো সম্পাদনা করতে হত তাঁকে। সকালে আবার ৮টার মধ্যেই কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হত। ফলে ঘুমের সময় কমে গিয়েছিল অনেকটাই। কাজের চাপে কখনও কখনও অফিসেও ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি। এই কঠিন রুটিন দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পারেন, দু’টি কাজ একসঙ্গে সামলানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। অন্য দিকে, কনটেন্ট তৈরির আয়ও বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত যখন সেই আয় চাকরির বেতনের তিন থেকে চার গুণে পৌঁছয়, তখন কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে পুরো সময় কনটেন্ট তৈরির কাজে মন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
‘বসের চাপ নেই, লক্ষ্য পূরণের তাড়া নেই’
চাকরি ছাড়ার পর নিজের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন শুভ। আগে নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছনো, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে কাজ করা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ ছিল। এখন নিজের কাজের সময় এবং পরিকল্পনা নিজেই ঠিক করতে পারেন তিনি। নিজের নতুন জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে শুভ জানিয়েছেন, এখন আর অফিসের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ নেই। বসের চাপ নেই, এমনকি মাইক্রোসফটের কাজের ঝামেলাও আর সামলাতে হয় না। স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারার সুযোগ তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। তবে তাঁর এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ পরিশ্রম। জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগে নিয়মিত ভিডিয়ো তৈরি করা, কাজের মান উন্নত করা এবং অনুগামীদের আগ্রহ ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
চাকরি ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন না শুভ
নিজের সাফল্যের কথা বললেও অন্যদের চাকরি ছেড়ে কনটেন্ট নির্মাতা হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন না শুভ। তাঁর মতে, এই পেশায় ঝুঁকি রয়েছে। সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয়তা বা ব্র্যান্ডের কাজ সব সময় একই রকম থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে অন্য কারও সাফল্যের গল্প দেখে নিজের চাকরি ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। শুভ নিজেও জানিয়েছেন, তাঁর ইএমআই মেটানোর দায়িত্ব ছিল। চাকরি ছাড়ার আগে নিয়মিত বেতন বন্ধ হয়ে গেলে কী ভাবে সেই কিস্তি দেবেন, তা নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন তিনি। কনটেন্ট তৈরির আয় যখন চাকরির বেতনের তুলনায় অনেকটা বেড়ে যায়, তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস পান।
তাঁর কাহিনি তাই এক দিকে যেমন সমাজমাধ্যমে নতুন পেশার সম্ভাবনা তুলে ধরছে, অন্য দিকে দেখাচ্ছে, স্বাধীন ভাবে উপার্জনের পথে ঝুঁকিও রয়েছে। কনটেন্ট তৈরি করে মাসে আড়াই লক্ষ টাকা আয় করা সম্ভব হলেও সেই জায়গায় পৌঁছতে প্রয়োজন দক্ষতা, নিয়মিত পরিশ্রম এবং ধৈর্য। চাকরি ছেড়ে স্বাধীন পেশায় যাওয়ার আগে তাই শুধু সম্ভাব্য আয় নয়, সঞ্চয়, নিয়মিত খরচ, ঋণের কিস্তি এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়গুলিও বিবেচনা করা জরুরি। শুভ সারাংয়ের সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু তাঁর পথ যে সবার জন্য একই রকম হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।





