নিউজ ডেস্ক: মাত্র ১৪ বছর বয়সে মাথায় এসেছিল নিজের দেশ তৈরির ভাবনা। সাত বছর পরে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দাবি করেন তিনি। এখন তাঁর বয়স ২১। নিজের তৈরি দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচয় দেন ড্যানিয়েল জ্যাকসন। এ বার মানবিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অনুষ্ঠানে পুরস্কার পেলেন ব্রিটিশ এই তরুণ। তাঁর কাহিনি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
দেশটির নাম ‘ফ্রি রিপাবলিক অফ ভার্ডিস’। ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার মাঝখানে দানিউব নদীর ধারে প্রায় ০.৫ বর্গকিলোমিটার জমিকে কেন্দ্র করে এই রাষ্ট্র গঠনের দাবি করেছেন জ্যাকসন। তাঁর বক্তব্য, দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তবিতর্কের জেরে ওই জমির কোনওটিই স্পষ্ট ভাবে নিজেদের বলে দাবি করেনি। সেই সুযোগেই বন্ধুদের নিয়ে সেখানে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি।
ড্যানিয়েল জ্যাকসনের জন্ম ব্রিটেনে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কয়েক জন বন্ধুর সঙ্গে বলকান অঞ্চলের মানচিত্র ঘাঁটতে গিয়ে দানিউব নদীর ধারের ওই জমির বিষয়ে জানতে পারেন তিনি। পরে ২০১৯ সালের ৩০ মে জমিটিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। নাম দেন ‘ফ্রি রিপাবলিক অফ ভার্ডিস’। নিজেকেই দেশের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন জ্যাকসন।
এর পর ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো। তৈরি হয় সংবিধান, আইন, মন্ত্রিসভা, জাতীয় পতাকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীক। এমনকি, পাসপোর্টও তৈরি করেছে তাঁর প্রশাসন বলে দাবি। ভার্ডিসের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি, ক্রোয়েশীয় ও সার্বীয় ভাষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির নিজস্ব মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরো।
জ্যাকসনের দাবি, ভার্ডিসের কয়েকশো নথিভুক্ত নাগরিক রয়েছেন। দেশটির নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়ে প্রতি মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এক হাজারেরও বেশি ইমেল আসে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে এই নাগরিকত্ব বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কোনও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই।
রাষ্ট্রপুঞ্জের অনুষ্ঠানে পুরস্কার কেন?
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সদর দফতরে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে জ্যাকসনকে মানবিক কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ভার্ডিসের তরফে পশ্চিম আফ্রিকার আইভরি কোস্টে সাহায্য পাঠানোর উদ্যোগের জন্য এই সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পুরস্কারটি প্রদান করে ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি রিসার্চ।
৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের যুবসমাজের অংশগ্রহণ সংক্রান্ত একটি অধিবেশনেও অংশ নেয় ভার্ডিসের প্রতিনিধিদল। সেখানে দেশটির মানবিক বিষয়ক মন্ত্রী জেফ্রি লি অতীতের সাহায্যকাজ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে ভার্ডিসের প্রশাসন।
এই স্বীকৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জ্যাকসন। তাঁর কথায়, এত অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক স্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া তাঁর কাছে বিশেষ অভিজ্ঞতা। তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত অনুষ্ঠানে পুরস্কার পাওয়া বা কোনও অধিবেশনে অংশ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ভার্ডিসকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ।
দেশ তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেখানে থাকা যায় না!
ভার্ডিসের সবচেয়ে বড় সমস্যা, যে জমিকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা এখনও সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালে ক্রোয়েশিয়ার পুলিশ জ্যাকসন-সহ কয়েক জনকে আটক করে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছিল বলে জানা গিয়েছে। জ্যাকসনের দাবি, এর পর তাঁকে ক্রোয়েশিয়ায় প্রবেশের উপর আজীবন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তাঁর আরও অভিযোগ, ভার্ডিসের উপকূলবর্তী এলাকায় নজরদারির জন্য ক্যামেরা বসিয়েছে ক্রোয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। সার্বিয়ার দিক থেকে জমিতে পৌঁছনোর পথও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাঁর। ফলে নিজেদের রাষ্ট্রের প্রশাসন গড়ে তোলার চেষ্টা চললেও কার্যত দেশের বাইরে থেকেই কাজ চালাতে হচ্ছে তাঁদের। জ্যাকসন এই পরিস্থিতিকে ‘নির্বাসিত সরকার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তবে ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যে জমিটির অবস্থান এবং তার আইনি মর্যাদা নিয়ে বিতর্কের কারণে ভার্ডিসের স্বাধীনতার দাবি আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত নয়। কোনও ভূখণ্ডকে স্বাধীন দেশ ঘোষণা করলেই তা আন্তর্জাতিক আইনে সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ভূখণ্ড, স্থায়ী জনসংখ্যা, কার্যকর সরকার এবং অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সক্ষমতার মতো একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরি ছেড়ে দেশের কাজে, পাশে বন্ধুদের দল
নিজের এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে জ্যাকসন আগের চাকরিও ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। আগে তিনি রোবলক্সের জন্য ভার্চুয়াল জগৎ তৈরির কাজ করতেন। এখন ভার্ডিসের প্রশাসন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই ব্যস্ত তিনি। তাঁর দাবি, এই উদ্যোগে একাধিক সহযোগী রয়েছেন, যাঁরা প্রশাসনিক কাজ থেকে মানবিক উদ্যোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য করছেন।
জ্যাকসনের কাছে ভার্ডিস শুধুই এক টুকরো জমি নয়, বরং নিজের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরীক্ষা। তাঁর বক্তব্য, বাইরে থেকে জায়গাটিকে সাধারণ অরণ্যভূমি বলে মনে হলেও, তাঁর কাছে সেটি নিজের তৈরি দেশের ভূখণ্ড।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কোনও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া একটি জমিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে কত দূর এগোনো সম্ভব? আপাতত ভার্ডিসের রাষ্ট্রপতির দাবি আন্তর্জাতিক কৌতূহল তৈরি করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে তার স্বীকৃতির পথ এখনও অনিশ্চিত।




