কলকাতা, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: বারুইপুরে ধর্ষণ-খুনের মামলায় মূল অভিযুক্ত পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর এনকাউন্টার ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে এ বার আরও স্পষ্ট অবস্থান নিল রাজ্য সরকার। অপরাধ দমনে পুলিশকে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়ার বার্তা দিয়ে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বললেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েই চলবে সরকার। তাঁর কথায়, আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ করা হবে।
বারুইপুরের ঘটনায় ১২ বছরের এক নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল প্রভাস মণ্ডলকে। পুলিশ জানিয়েছিল, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য তাঁকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করেন অভিযুক্ত। পাল্টা গুলিতে গুরুতর জখম হন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার পর থেকেই ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের পাশাপাশি সমাজের একাংশও পুলিশের ভূমিকা এবং আইন মেনে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন তুলেছে। সেই আবহেই দিলীপের বক্তব্য—অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া হাতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশকে পিছিয়ে রাখা হবে না।
দিলীপের বক্তব্যে উঠে এসেছে দেশের কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যের উদাহরণও। তাঁর দাবি, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, অসম এবং মধ্যপ্রদেশে পুলিশ যে ভাবে অপরাধ দমনে কাজ করে, বাংলাতেও পুলিশকে সেই রকম ‘অপারেশনাল ফ্রিডম’ দেওয়া হবে। অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনও আপস করা হবে না—এটাই তাঁর বার্তার মূল সুর।
বারুইপুরের ঘটনার পর অবশ্য রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। এনকাউন্টারকে ‘অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান’-এর নজির হিসাবে দেখাচ্ছে শাসকপক্ষ। অন্য দিকে, সমালোচকদের বক্তব্য, পুলিশি হেফাজতে থাকা কোনও অভিযুক্তের মৃত্যু নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ফলে দিলীপের মন্তব্য নতুন করে সেই বিতর্ককে সামনে এনে দিয়েছে।
এর আগে ভোটের প্রচারেও দিলীপ পশ্চিমবঙ্গে উত্তরপ্রদেশের ধাঁচে এনকাউন্টারের কথা বলেছিলেন। সে সময় তাঁর বক্তব্য ঘিরে তৃণমূলের তরফে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছিল।
এ বার সরকারে এসে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট করলেন দিলীপ। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য, শুধু একটি এনকাউন্টারকে সমর্থন করা নয়—অপরাধ দমনে রাজ্যের পুলিশের কাজের ধরন বদলেরও ইঙ্গিত। ফলে বারুইপুরের ঘটনা ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন বৃহত্তর প্রশ্নে পৌঁছেছে—অপরাধ দমনে কঠোর পুলিশি পদক্ষেপের সীমা কোথায়, আর আইনের শাসনের সীমানাই বা কোথায়?
বার্তা অবশ্য পরিষ্কার অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক, রেয়াত করা হবে না। আর সেই বার্তা বাস্তবে কী ভাবে কার্যকর হয়, আগামী দিনে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই তার উত্তর দেবে।