নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: পাখি কি সত্যিই ডাইনোসরের উত্তরসূরি? বিবর্তনের এই বহু পুরনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এ বার বিজ্ঞানীদের নজর পড়েছে এমন এক জায়গায়, যেখানে এত দিন তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি ডাইনোসরের পেটের পাথর বা ‘গ্যাস্ট্রোলিথ’-এ। নতুন গবেষণা বলছে, সেই পাথরের আকার ও গঠন বিশ্লেষণ করেই বোঝা যেতে পারে কোন ডাইনোসরের পাকস্থলী কতটা শক্তিশালী ছিল, কী ধরনের খাবার খেত তারা এবং শেষ পর্যন্ত কী ভাবে পাখির মতো পরিপাকতন্ত্রের বিবর্তন ঘটেছিল।
সম্প্রতি Paleobiology পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় ৪৬টি জীবিত আর্কোসর প্রজাতির ১০৪টি নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। আধুনিক পাখি ও কুমির-সহ এই প্রাণীদের পাকস্থলীতে থাকা পাথরের আকৃতি এবং তাদের পরিপাক পদ্ধতির মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বার করাই ছিল গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য। সেই তথ্যের সঙ্গে জীবাশ্ম ডাইনোসরের গ্যাস্ট্রোলিথ মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি লুকিয়ে রয়েছে পাথরের আকৃতিতে। বিজ্ঞানীদের মতে, গোলাকার ও মসৃণ গ্যাস্ট্রোলিথ শক্তিশালী, পেশিবহুল পাকস্থলীর ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের পাকস্থলী খাবারকে পাথরের সঙ্গে ঘষে যান্ত্রিক ভাবে ভেঙে দিতে পারে। আধুনিক পাখির ‘গিজার্ড’-এর কাজও অনেকটা এমনই। অন্য দিকে, তুলনায় বেশি কৌণিক বা ধারালো পাথর দুর্বলতর পাকস্থলীয় ঘর্ষণ-ক্ষমতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
আর এখানেই মিলেছে বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, উদ্ভিদভোজী অনেক অ-পাখি ডাইনোসরের ক্ষেত্রে কৌণিক পাথরই বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ তাদের খাবার প্রক্রিয়াকরণে মুখ ও দাঁতের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল দেহের সরোপডদের ক্ষেত্রেও পাথরের ধরন থেকে শক্তিশালী গিজার্ডের বদলে দীর্ঘ সময় ধরে খাবার পাকস্থলীতে রেখে দেওয়া এবং গাঁজনের মাধ্যমে হজম করার প্রবণতার ইঙ্গিত মিলেছে।
কিন্তু গল্পটা বদলে যায় থেরোপডদের ক্ষেত্রে যে গোষ্ঠীর মধ্যেই শেষ পর্যন্ত পাখির পূর্বপুরুষদের দেখা যায়। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, থেরোপডদের একটি শাখায়, বিশেষ করে ম্যানির্যাপ্টরিফর্মদের গোড়ার দিকেই, শক্তিশালী পেশিবহুল পাকস্থলীর বিবর্তন ঘটে থাকতে পারে। অর্থাৎ পাখির গিজার্ড কোনও হঠাৎ আবির্ভূত বৈশিষ্ট্য নয়; তার শিকড় ডাইনোসরদের বিবর্তনের অনেক গভীরে।
এর তাৎপর্য আরও বড়। দাঁত ছোট হতে শুরু করলে বা খাদ্য চিবোনোর ক্ষমতা কমলে খাবারকে ভাঙার দায়িত্ব ক্রমশ পাকস্থলীর উপর চলে আসতে পারে। শক্তিশালী গিজার্ড সেই কাজ সামলাতে পারত। ফলে মুখ ও চোয়ালের গঠন বদলানোর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও নতুন বিবর্তনীয় পথ খুলে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই পরিবর্তনই পরবর্তী সময়ে পাখিদের নানা ধরনের খাদ্য গ্রহণের ক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
অবশ্য পাখির ডাইনোসর-উৎপত্তির প্রমাণ শুধু এই পাথরেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় ১৬ কোটি বছর আগের Anchiornis নামের এক থেরোপড ডাইনোসরের জীবাশ্মে পাওয়া গ্যাস্ট্রিক পেলেটেও পাখির মতো পরিপাক ব্যবস্থার প্রাচীন সূত্র মিলেছিল। সেই পেলেটে টিকটিকির হাড় ও মাছের আঁশের অবশেষ পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এই ধরনের পেলেট তৈরি ও উগরে দেওয়ার ক্ষমতা আধুনিক পাখির উন্নত পরিপাক ব্যবস্থার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিল দেখায়।
অর্থাৎ, পাখির জন্মের গল্পে পালক, ডানা বা হালকা হাড়ের পাশাপাশি পেটের ভিতরের এই ছোট ছোট পাথরও হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ ‘জীবাশ্ম দলিল’। কোটি কোটি বছর আগে ডাইনোসর কী ভাবে খাবার হজম করত, সেই তথ্যই হয়তো ধীরে ধীরে প্রকাশ করছে কী ভাবে একদল মাংসাশী থেরোপডের শরীরে তৈরি হয়েছিল এমন এক পরিপাক ব্যবস্থা, যা পরবর্তী সময়ে আকাশে উড়তে থাকা পাখিদের বিবর্তনের পথে বড় ভূমিকা নেয়।
বিজ্ঞানীদের কাছে তাই এই আবিষ্কারের আসল গুরুত্ব কোনও একটি ‘হারানো পাখি’-র সন্ধান নয়। বরং ডাইনোসর থেকে পাখি হয়ে ওঠার দীর্ঘ বিবর্তনীয় যাত্রায় শরীরের ভিতরের পরিবর্তনগুলি কখন এবং কী ভাবে ঘটেছিল, তার আরও নির্ভরযোগ্য ছবি তৈরি হওয়া। আর সেই ছবিতে এ বার বড় হয়ে উঠল ডাইনোসরের পেটের কয়েকটি ছোট পাথর।