দুবাই: বিদেশে কাজ, হাতে বিদেশি মুদ্রা, আর মাসের শেষে মোটা অঙ্কের আয়—অনেকের কাছেই এমন জীবন স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে যদি লুকিয়ে থাকে প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা? সকালে পেট ভরে খেলেও রাতে খাবার জুটবে কি না, তা নিয়ে যদি চিন্তা করতে হয়? দুবাইয়ে পুরোহিতের কাজ করতে গিয়ে এমনই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন ভারতের এক বাসিন্দা। নির্দিষ্ট মাসিক বেতন ছাড়াই কী ভাবে দিন কাটিয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা সম্প্রতি ভাগ করে নিয়েছেন মধ্যপ্রদেশের জবলপুরের নীরজ শাস্ত্রী। তাঁর কাহিনি ঘিরে সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা।
দুবাইয়ে হিন্দু পুরোহিত হিসেবে পুজো ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নীরজ। কিন্তু কাজের জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট বেতন পাওয়ার সুযোগ ছিল না তাঁর। উপার্জনের মূল ভরসা ছিল পুজো করানোর পর ভক্তদের দেওয়া দক্ষিণা। কখনও কোনও অনুষ্ঠানে মিলত ২০০ দিরহাম, কখনও আবার ৫০০ দিরহাম। ভারতীয় মুদ্রায় যা আনুমানিক ৪,৮০০ থেকে ১২,০০০ টাকার কাছাকাছি। কিন্তু এই টাকা নিয়মিত আসত না। কোনও দিন কাজ মিলত, কোনও দিন মিলত না। ফলে মাসের শেষে মোট কত টাকা হাতে থাকবে, তা আগে থেকে হিসাব করা কার্যত অসম্ভব ছিল।
এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে নীরজ জানিয়েছেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল খাবারের নিশ্চয়তা না থাকা। সকালে নাশতা করার পরও অনেক সময় ভাবতে হত, রাতে খাবার জোগাড় হবে কী ভাবে। বিদেশের মাটিতে কাজ করছেন, অথচ পরের বেলার খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে—এই বাস্তবতা তাঁর কাছে ছিল অত্যন্ত কঠিন। দুবাইয়ের মতো ব্যয়বহুল শহরে অনিয়মিত আয়ের উপর নির্ভর করে জীবন চালানো যে কতটা চাপের, তা তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট।
বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার আগে অনেকেই সম্ভাব্য বেতনের অঙ্ককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু নীরজের অভিজ্ঞতা দেখায়, আয় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও নিয়মিত উপার্জনের নিশ্চয়তা না থাকলে দৈনন্দিন জীবন সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাঁদের আয় নির্ভর করে অনুষ্ঠান, কাজের সুযোগ কিংবা অন্যের দেওয়া পারিশ্রমিকের উপর, তাঁদের পক্ষে মাসিক খরচের পরিকল্পনা করা সহজ নয়। বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে নিয়মিত আয়ের গুরুত্ব তখন আরও বেশি করে অনুভূত হয়।
নীরজের এই অভিজ্ঞতা বিদেশে কর্মরত বহু ভারতীয়ের জীবনের একটি অচেনা দিক সামনে এনেছে। বিদেশে কাজ মানেই যে আর্থিক স্বচ্ছলতা, এমন নয়। কাজের ধরন, পারিশ্রমিকের নিয়ম, বসবাসের খরচ এবং কাজের ধারাবাহিকতা—সব কিছুর উপরেই নির্ভর করে বাস্তব পরিস্থিতি। নির্দিষ্ট বেতন না থাকলে কোনও মাসে ভাল আয় হতে পারে, আবার অন্য মাসে প্রয়োজনীয় খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে নিজের জীবনের লড়াইয়ের কথা বলার পাশাপাশি নীরজের বক্তব্যে উঠে এসেছে সম্প্রীতির বার্তাও। তাঁর মতে, দেশ বা ধর্মের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পারলেই সমাজ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
নীরজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সমাজমাধ্যমে অনেকে সহমর্মিতা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিদেশে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন যাঁরা, তাঁদের শুধু সম্ভাব্য আয়ের অঙ্ক নয়, কাজের স্থায়িত্ব এবং জীবনযাপনের খরচ সম্পর্কেও আগে থেকে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ বিদেশে পৌঁছনোই শেষ কথা নয়, সেখানে নিজের জীবনকে স্থিতিশীল করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নীরজের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। তবে তাঁর অতীতের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—বিদেশে কাজের সুযোগ বেছে নেওয়ার সময় শুধু কত টাকা আয় হতে পারে, তা দেখলেই কি যথেষ্ট? নাকি সেই আয় কতটা নিয়মিত, দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে কতটা সঞ্চয় করা সম্ভব এবং বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেগুলিও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার?
দুবাইয়ে পুরোহিতের কাজ করতে গিয়ে নীরজের লড়াই তাই শুধু এক ব্যক্তির কষ্টের কাহিনি নয়। এটি বিদেশে নতুন জীবন গড়তে যাওয়া মানুষের স্বপ্ন, অনিশ্চয়তা এবং টিকে থাকার সংগ্রামেরও এক ছবি।





