বিশেষ প্রতিবেদন: ভোটার তালিকায় কার নাম রয়েছে, কার নাম বাদ গিয়েছে, কোথাও একই ভোটারের নাম একাধিক বার উঠেছে কি না—এ বার আরও সহজে তা খতিয়ে দেখতে পারবেন রাজনৈতিক দলগুলি। দীর্ঘদিনের বিতর্কের পর ভোটার তালিকার ডিজিটাল সংস্করণ নিয়ে অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল নির্বাচন কমিশন। নতুন নির্দেশে ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার খসড়া ও চূড়ান্ত সংস্করণ স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলিকে ‘রিডেবল পিডিএফ’ বা সহজে পড়া ও কম্পিউটারের সাহায্যে খোঁজ করা যায়, এমন ফরম্যাটে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভোটার তালিকা ‘মেশিন-রিডেবল’ করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই সরব ছিল কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি। কমিশনের এই সিদ্ধান্তে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এত দিন যে দাবি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘাত চলেছে, সেই দাবিতে এ বার কেন সায় দিতে হল কমিশনকে?
১৫ অক্টোবর জারি করা নির্দেশে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন বা ‘স্পেশাল সামারি রিভিশন’ (এসএসআর)-এর আওতায় থাকা ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রতিটি বুথের ভোটার তালিকার দু’টি করে কপি দিতে হবে। একটি কাগজে ছাপা সংস্করণ, অন্যটি ডিজিটাল কপি। ডিজিটাল সংস্করণটি এমন পিডিএফ ফরম্যাটে দিতে হবে, যাতে তার মধ্যে থাকা তথ্য পড়া ও খোঁজা যায়। ভোটারদের ছবি অবশ্য ওই ডিজিটাল কপিতে থাকবে না। পাশাপাশি, ভোটার তালিকায় নতুন নাম সংযোজন, নাম বাদ দেওয়া এবং তথ্য সংশোধনের তালিকাও রাজনৈতিক দলগুলিকে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বুঝতে গেলে ‘মেশিন-রিডেবল’ ভোটার তালিকা বলতে কী বোঝায়, তা জানা জরুরি। সাধারণ স্ক্যান করা পিডিএফ অনেকটা কাগজের পাতার ছবির মতো। কম্পিউটারে সেই ফাইল খুলে দেখা গেলেও তার ভিতরে থাকা নাম বা ঠিকানা সরাসরি খোঁজা, বাছাই করা কিংবা তথ্য বিশ্লেষণ করা সব সময় সম্ভব হয় না। অন্য দিকে, মেশিন-রিডেবল বা কম্পিউটারে পাঠযোগ্য ফরম্যাটে তথ্য থাকলে নির্দিষ্ট নাম, ঠিকানা কিংবা অন্যান্য তথ্য দ্রুত খুঁজে দেখা যায়। বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য অসঙ্গতি চিহ্নিত করাও তুলনায় সহজ হয়।
ধরা যাক, কোনও বুথের তালিকায় একই নাম ও কাছাকাছি ঠিকানার একাধিক এন্ট্রি রয়েছে। স্ক্যান করা ছবির মতো পিডিএফে সেগুলি খুঁজতে হলে পাতার পর পাতা হাতে ধরে পরীক্ষা করতে হতে পারে। কিন্তু পাঠযোগ্য ডিজিটাল তালিকায় কম্পিউটারের সাহায্যে নাম ও অন্যান্য তথ্য খুঁজে মিলিয়ে দেখা অনেক সহজ। একই ভাবে, সংশোধনের আগে ও পরে কোনও ভোটারের তথ্য বদলেছে কি না, নতুন নাম যুক্ত হয়েছে কি না কিংবা কোনও নাম বাদ পড়েছে কি না, তা যাচাই করার কাজেও সুবিধা হতে পারে। তবে একই নাম বা কাছাকাছি ঠিকানা থাকলেই যে দু’টি এন্ট্রি ভুয়ো, এমন নয়। প্রকৃত অসঙ্গতি নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট ভোটারের সম্পূর্ণ তথ্য ও নথি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এই কারণেই ভোটার তালিকার পাঠযোগ্য ডিজিটাল সংস্করণকে স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক দলগুলির নজরদারির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিরোধীরা। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা শুধু নির্বাচনের প্রশাসনিক নথি নয়; নির্বাচনে কারা ভোট দেওয়ার অধিকার পাচ্ছেন, তা নির্ধারণের অন্যতম ভিত্তি। ফলে তালিকার তথ্য যাচাই করার সুযোগ যত বাড়বে, ভুল বা অনিচ্ছাকৃত বাদ পড়ার ঘটনা চিহ্নিত করার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
২০১৮ সাল থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত
ভোটার তালিকা মেশিন-রিডেবল ফরম্যাটে দেওয়ার দাবি নতুন নয়। ২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস নেতা কমল নাথ এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ভোটার তালিকা এমন ফরম্যাটে প্রকাশ করা হোক, যাতে তথ্য খুঁজে দেখা এবং সম্ভাব্য ভুয়ো বা একাধিক এন্ট্রি শনাক্ত করা সহজ হয়। সেই সময় নির্বাচন কমিশন এই দাবির বিরোধিতা করে। ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং সেই তথ্যের অপব্যবহার বা ব্যাপক ভাবে তথ্য সংগ্রহের আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছিল।
২০১৯ সালে মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ভোটার তালিকা প্রকাশের ফরম্যাট নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়। আদালত জানিয়েছিল, প্রচলিত নিয়মে ভোটার তালিকা কী ভাবে প্রকাশ করা হবে, সেই বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের ভূমিকা রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলি যে কোনও নির্দিষ্ট ফরম্যাটে তালিকা পাওয়ার দাবি করলেই তা স্বয়ংক্রিয় ভাবে মানতে হবে, এমন নয়।
এর পরেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক থামেনি। ২০২৫ সালের জুনে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে ভোটার তালিকার সংহত, ডিজিটাল ও মেশিন-রিডেবল সংস্করণ দেওয়ার দাবি জানান। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁরা তালিকার পরিবর্তনের ইতিহাস ও সময়ের নথিও প্রকাশের দাবি করেছিলেন। ভোটের দিন বুথের সিসিটিভি ফুটেজ বা ভিডিয়ো সংরক্ষণ ও প্রকাশের বিষয়টিও তুলেছিল কংগ্রেস।
তখন নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছিল, মেশিন-রিডেবল তালিকার দাবি প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যে গ্রহণযোগ্য নয়। কমিশনের বক্তব্য ছিল, ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার নির্দিষ্ট ভিত্তি ও প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়ম মেনেই কাজ করা হয় বলেও কমিশন দাবি করে। ফলে ২০২৫ সালে যে দাবি নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের নতুন নির্দেশে সেই বিতর্কে নতুন মোড় এল।
এসআইআর বিতর্কের আবহেই নতুন নির্দেশ
এই সিদ্ধান্তের সময়টিও রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশজুড়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক ও প্রতিবাদ চলছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং দরিদ্র, প্রবীণ, পরিযায়ী শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক বার নথিভুক্ত বা অন্য কারণে অযোগ্য ভোটারের নাম চিহ্নিত করে তালিকা নির্ভুল করাই সংশোধনের উদ্দেশ্য।
এই পরিস্থিতিতে কমিশনের নতুন নির্দেশকে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না রাজনৈতিক মহলের একাংশ। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে তালিকা আরও সহজে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের সব অভিযোগকে স্বীকার করে নেওয়ার সমান নয়। কমিশন কেন এই ফরম্যাটে তালিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এবং নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের ফল—দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ।
কোন ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া?
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে যে ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন হবে, তার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, গোয়া, মণিপুর, অসম, বিহার, ছত্তীসগঢ়, গুজরাত, কেরল, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লাক্ষাদ্বীপ এবং পুদুচেরি। এই তালিকার মধ্যে উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব ও মণিপুরের মতো রাজ্যে আগামী বছরের গোড়ায় বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলির কাছে তালিকা পৌঁছনোর সময়সীমা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
মিশনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, বুথ পুনর্বিন্যাসের কাজ ২ নভেম্বরের মধ্যে করার কথা। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত দিন ১২ নভেম্বর। ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নাম সংযোজন, বাদ দেওয়া বা সংশোধন নিয়ে দাবি ও আপত্তি জানানো যাবে। সেই দাবি ও আপত্তির নিষ্পত্তির জন্য ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় রাখা হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত দিন ৪ জানুয়ারি ২০২৭।
এসএসআর এবং এসআইআরের মধ্যে পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধনে বিদ্যমান ভোটারদের নাম নতুন তালিকায় বহাল থাকে। পাশাপাশি নতুন যোগ্য ভোটারের নাম যুক্ত করা, মৃত বা অন্যত্র স্থায়ী ভাবে চলে যাওয়া ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং তথ্য সংশোধনের কাজ হয়। এসআইআরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত নথি চাওয়ার মতো প্রক্রিয়া থাকতে পারে। তাই দুই ধরনের সংশোধনকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
স্বচ্ছতা বাড়বে, না কি গোপনীয়তার প্রশ্ন উঠবে?
মেশিন-রিডেবল ভোটার তালিকার সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনই কিছু সতর্কতার জায়গাও রয়েছে। ভোটারদের নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য যদি সহজে অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করা যায়, তা হলে সেই তথ্যের অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থাও জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলিকে তালিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশন ভোটারদের ছবি বাদ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তবে তথ্য কী ভাবে ব্যবহার করা হবে, কারা তা সংগ্রহ করতে পারবেন এবং কোনও ব্যক্তির তথ্য অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
অন্য দিকে, শুধু পাঠযোগ্য ফরম্যাটে তালিকা প্রকাশ করলেই ভোটার তালিকার সব সমস্যা মিটে যাবে না। ভুল তথ্য, একই নামের একাধিক ব্যক্তি, ঠিকানার পরিবর্তন কিংবা যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ যাচাই করতে বুথস্তরের নথি, সংশোধনের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলির পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোনও অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকার পাঠযোগ্য ডিজিটাল সংস্করণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন অধ্যায় খুলেছে। কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে এই পদক্ষেপের মিল রয়েছে, কিন্তু এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলি কতটা কার্যকর ভাবে তালিকা যাচাই করতে পারে এবং সেই যাচাইয়ে পাওয়া অসঙ্গতির সমাধান কত দ্রুত হয়, তার উপর। ভোটার তালিকা সংশোধনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—এক দিকে অযোগ্য ও ভুয়ো এন্ট্রি চিহ্নিত করা, অন্য দিকে কোনও যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার যাতে ভুলবশত খর্ব না হয়, তা নিশ্চিত করা। নতুন প্রযুক্তি সেই লক্ষ্য পূরণে কতটা সাহায্য করে, এখন সেটাই দেখার।





