ইউক্রেন: যুদ্ধের ময়দানে এখন শুধু কামান, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা যুদ্ধবিমান নয়, জয়-পরাজয়ের হিসাব বদলে দিতে পারে মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো উপগ্রহও। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ এবং ড্রোন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে সামনে এসেছে একটি বিশেষ নাম, ‘স্টারশিল্ড’। ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত এই ব্যবস্থার উপর বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধের ময়দানে একটি বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থার ভূমিকা ঠিক কতটা? আর মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ব্যবস্থায় শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে?
বিতর্কের সূত্রপাত ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ড্রোন পরিচালনায় স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিঘ্নের অভিযোগ থেকে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, সম্প্রতি যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতিসংক্রান্ত বিধিনিষেধের জেরে বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযান ব্যাহত হয়েছে। রাশিয়ার আক্রমণকারী ড্রোন প্রতিহত করার পাশাপাশি ইউক্রেনের নিজস্ব ড্রোন পরিচালনার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়। ইউক্রেনের সামরিক কর্তাদের অভিযোগ, আগে থেকে সতর্ক না করেই এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছিল। তবে স্টারলিঙ্ক এবং স্টারশিল্ডকে একই পরিষেবা বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দু’টিই স্পেসএক্সের প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ এবং কাজের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক বিতর্কে সেই পার্থক্যই বিশেষ ভাবে আলোচনায় এসেছে।
স্টারলিঙ্ক ও স্টারশিল্ডের পার্থক্য কোথায়?
স্টারলিঙ্ক মূলত বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা উপগ্রহের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা প্রত্যন্ত অঞ্চল, দুর্গম এলাকা এবং প্রচলিত ব্রডব্যান্ড পরিষেবা দুর্বল এমন জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দেয়। ইউক্রেনের যুদ্ধেও এই পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য আদানপ্রদান, রসদ সরবরাহের সমন্বয় এবং প্রতিরক্ষামূলক ড্রোন পরিচালনায় স্টারলিঙ্কের সংযোগ ব্যবহার করা হয়। অন্য দিকে, স্টারশিল্ড তৈরি হয়েছে মূলত মার্কিন সরকারের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলির প্রয়োজন মেটানোর জন্য। স্পেসএক্সের এই ব্যবস্থায় নিরাপদ যোগাযোগ, সংবেদনশীল তথ্য আদানপ্রদান এবং সরকারি নিরাপত্তা সংস্থার প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ প্রযুক্তি সংযুক্ত করার সুবিধা রয়েছে। স্টারশিল্ডের পরিষেবা মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে এর ব্যবহার কী ভাবে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে পরিষেবার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দুই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত ভিত্তির মধ্যে মিল থাকলেও তাদের কার্যকারিতা ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো আলাদা। স্টারলিঙ্কের বাণিজ্যিক পরিষেবাকে স্টারশিল্ডের সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে এক করে দেখলে বিষয়টি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
স্টারশিল্ড নিয়ে বিতর্কের মধ্যে স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক স্পষ্ট করেছেন, এই ব্যবস্থার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সরকারের হাতে। তাঁর বক্তব্য, স্টারশিল্ডের গতি বা ব্যবহারের উপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে কি না, তা ঠিক করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট। মাস্কের এই বক্তব্যের তাৎপর্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্পেসএক্স প্রযুক্তিটি তৈরি করলেও স্টারশিল্ডের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংস্থাটির একার হাতে নেই। মার্কিন সরকারের সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এই পরিষেবার ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে, স্টারলিঙ্ক একটি বাণিজ্যিক পরিষেবা, যার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ স্পেসএক্সের হাতে। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, স্টারলিঙ্কের ব্যবহার বেসামরিক এবং প্রতিরক্ষামূলক কাজের জন্য অনুমোদিত; বাণিজ্যিক পরিষেবাকে সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানের কাজে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয় না।
এই পার্থক্যই ইউক্রেনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে একই ধরনের স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা থাকলেও কোন পরিষেবার ক্ষেত্রে কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা সব সময় স্পষ্ট নয়। ফলে কোনও বিধিনিষেধ কার্যকর হলে তার দায় কার, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ড্রোনের অভিযান ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার আক্রমণকারী ড্রোন প্রতিহত করতে এবং নিজেদের ড্রোন পরিচালনা করতে স্যাটেলাইট যোগাযোগের উপর নির্ভরশীল। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত গতিতে চলা ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অভিযানের সমন্বয় ব্যাহত হতে পারে। সম্প্রতি ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, স্যাটেলাইট সংযোগের উপর গতিসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপের ফলে কয়েকটি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট গতির বেশি চললে কিছু ড্রোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। এতে আক্রমণাত্মক অভিযানের পাশাপাশি রাশিয়ার ড্রোন প্রতিহত করার প্রচেষ্টাও সমস্যায় পড়ে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভের দাবি, এই বিধিনিষেধের বিষয়ে সামরিক বাহিনী আগে থেকে সতর্কবার্তা পায়নি। ফলে বেশ কয়েকটি অভিযান ব্যাহত হয়। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, যুদ্ধের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় হঠাৎ পরিবর্তন সামরিক বাহিনীর জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে বিধিনিষেধের সম্পূর্ণ পরিসর, প্রতিটি অভিযানে তার প্রভাব এবং কোন পরিষেবায় ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সব তথ্য স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই ইউক্রেনের অভিযোগ এবং স্পেসএক্সের বক্তব্যের পাশাপাশি মার্কিন সরকারের ভূমিকা সম্পর্কিত তথ্যও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সংঘাতের ছায়া
স্যাটেলাইট যোগাযোগ নিয়ে এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে মতপার্থক্য বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দ্রুত সমঝোতার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন। অন্য দিকে, ইউক্রেনের বক্তব্য, রাশিয়ার সামরিক আক্রমণ অব্যাহত থাকলে নিজেদের প্রতিরক্ষা ও পাল্টা অভিযান চালানোর সক্ষমতা বজায় রাখা জরুরি। রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিতে ইউক্রেনের হামলা নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান আলাদা। ট্রাম্পের বক্তব্য, এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে এবং যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। ইউক্রেনের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালালে মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতার উপর চাপ তৈরি করা সম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিধিনিষেধের অভিযোগ কিয়েভের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের আশঙ্কা, আমেরিকার প্রযুক্তি ও সামরিক সহায়তার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। তবে স্টারশিল্ডের উপর বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত সরাসরি ট্রাম্প নিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রকাশ্যে ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। মাস্ক বলেছেন, স্টারশিল্ডের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন সরকার ও সামরিক কর্তৃপক্ষ। অন্য দিকে, মার্কিন প্রশাসনের একাংশ ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকৃত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মেটেনি।
যুদ্ধের ময়দানে প্রযুক্তির উপর নির্ভরতার ঝুঁকি
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। সামরিক বাহিনী যখন বেসরকারি সংস্থার তৈরি প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে, তখন সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহারের শর্ত এবং পরিষেবা বন্ধ বা সীমিত করার ক্ষমতা কৌশলগত গুরুত্ব পায়। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধু তথ্য আদানপ্রদানের মাধ্যম নয়; তা ড্রোন পরিচালনা, সেনাদের সমন্বয়, নজরদারি এবং প্রতিরক্ষার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। একইসঙ্গে স্যাটেলাইট পরিষেবা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলিরও নিজস্ব প্রযুক্তিগত, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে কোনও দেশ বা সামরিক বাহিনী এই ধরনের ব্যবস্থার উপর নির্ভর করার আগে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা, জরুরি পরিস্থিতিতে পরিষেবা বজায় রাখার পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণের শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে চায়। স্টারশিল্ড বিতর্ক তাই শুধু স্পেসএক্স বা ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সমস্যা নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তি তৈরি করছে বেসরকারি সংস্থা, কিন্তু তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করছে রাষ্ট্র—এই দুইয়ের সম্পর্কই আগামী দিনে যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে।





