নিউ ইয়র্ক: গাড়ি তৈরি থেকে মহাকাশে রকেট পাঠানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা—এ বার কি সব কিছুই চলে আসবে একই কর্পোরেট ছাতার তলায়? সেই সম্ভাবনাই উস্কে দিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম ধনী শিল্পপতি এলন মাস্ক। তাঁর দুই সংস্থা টেসলা ও স্পেসএক্সের সম্ভাব্য সংযুক্তির বাজারমূল্য হতে পারে প্রায় ৩.৫ লক্ষ কোটি ডলার। বাস্তবায়িত হলে তা বিশ্বের বৃহত্তম কর্পোরেট লেনদেনগুলির অন্যতম হবে। কিন্তু এই মহামিলনের পক্ষে মাস্কের প্রকাশ্য সমর্থনই এখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কয়েক জনের আশঙ্কা, তাঁর মন্তব্যের ফলে শেয়ারহোল্ডারদের নজরদারি বাড়তে পারে, স্বার্থের সংঘাত নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে এবং চুক্তির প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে যেতে পারে।
সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছেন মাস্ক নিজেই। তিনি টেসলা ও স্পেসএক্স—দুই সংস্থারই প্রধান নির্বাহী। দুই সংস্থায় তাঁর উল্লেখযোগ্য মালিকানাও রয়েছে। ফলে একটি সংস্থার সঙ্গে অন্যটির সংযুক্তির সিদ্ধান্তে তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে টেসলার সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ যথাযথ ভাবে রক্ষা করা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মাস্ক নিজেও স্বীকার করেছেন, এই সম্ভাব্য চুক্তিতে তিনি স্বার্থের সংঘাতের কারণে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন না। দুই সংস্থার স্বাধীন পরিচালকদের নিয়ে গঠিত বিশেষ কমিটিই চুক্তির শর্ত খতিয়ে দেখবে। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন হবে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনও।
কী নিয়ে আলোচনা?
টেসলা মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, শক্তি সঞ্চয়, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালানোর প্রযুক্তি ও রোবোটিক্সের ব্যবসায় যুক্ত। অন্য দিকে, স্পেসএক্সের মূল ক্ষেত্র রকেট উৎক্ষেপণ, মহাকাশ পরিবহণ এবং স্টারলিঙ্কের উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই সংস্থার প্রযুক্তিগত লক্ষ্য ক্রমশ কাছাকাছি এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত চিপ, রোবোটিক্স, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন—এই সব ক্ষেত্রেই তাদের ব্যবসার মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে।
মাস্কের যুক্তি, দুই সংস্থাকে এক করা গেলে গবেষণা, প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ আরও সমন্বিত ভাবে করা সম্ভব হবে। আলাদা আলাদা সংস্থার বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে কাজ করার বদলে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। টেসলার গাড়ি ও রোবটের জন্য যে উন্নত চিপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন, স্পেসএক্সের মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিং প্রকল্পেও তার ব্যবহার হতে পারে। আবার টেসলার ব্যাটারি ও শক্তি সঞ্চয়ের প্রযুক্তি স্পেসএক্সের ভবিষ্যৎ ডেটা সেন্টারের কাজে লাগতে পারে। মাস্কের পরিকল্পনায় তাই শুধু গাড়ি ও রকেটকে এক করা নয়, বরং পৃথিবী থেকে মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রযুক্তির একটি সমন্বিত সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি নিজেই সতর্ক করেছেন, সংযুক্তি নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। দুই সংস্থার বিশেষ কমিটি এখনও চুক্তির শর্তে একমত হয়নি।
কী ভাবে জুড়তে পারে দুই সংস্থা?
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের মতে, একাধিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্পেসএক্স টেসলাকে অধিগ্রহণ করতে পারে। আবার নতুন কোনও হোল্ডিং সংস্থা তৈরি করে তার অধীনে দুই সংস্থাকে আনার কথাও বিবেচনায় রয়েছে। চুক্তির বিনিময়ে নগদ অর্থ দেওয়া হবে, নাকি শেয়ারের মাধ্যমে লেনদেন হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে কোনও কাঠামোই এখনও চূড়ান্ত হয়নি। দুই সংস্থার স্বাধীন পরিচালকদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে এবং পরামর্শদাতাদের নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের কাজ হবে সম্ভাব্য চুক্তির আর্থিক মূল্যায়ন, শর্ত এবং শেয়ারহোল্ডারদের উপর তার প্রভাব খতিয়ে দেখা। বিশেষ করে টেসলার সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই সংযুক্তি থেকে কতটা লাভবান হবেন, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মাস্কের মালিকানার হিসাবও এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। টেসলায় তাঁর অংশীদারি প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। অন্য দিকে, স্পেসএক্সে তাঁর অংশীদারি প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। দুই সংস্থা এক হলে সম্মিলিত ব্যবসায় তাঁর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। তবে ঠিক কতটা নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে থাকবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির মূল্যায়ন, শেয়ারের বিনিময় অনুপাত এবং নতুন সংস্থার পরিচালন কাঠামোর উপর।
সোলারসিটি-কাণ্ডের ছায়া
বর্তমান বিতর্কে বার বার ফিরে আসছে ২০১৬ সালে টেসলার সোলারসিটি অধিগ্রহণের ঘটনা। সোলারসিটি ছিল সৌরবিদ্যুৎ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থা, যার প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন মাস্কের আত্মীয়েরা। অধিগ্রহণের সময় সোলারসিটিতে মাস্কের নিজেরও উল্লেখযোগ্য অংশীদারি ছিল। টেসলা সংস্থাটিকে অধিগ্রহণ করার পরে কয়েক জন শেয়ারহোল্ডার অভিযোগ করেন, মাস্ক নিজের বিনিয়োগের স্বার্থে চুক্তির প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়েছিলেন। সেই অভিযোগ ঘিরে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। শেয়ারহোল্ডারদের দাবি ছিল, মাস্কের প্রভাব এবং পরিচালকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণে চুক্তির সিদ্ধান্ত যথেষ্ট স্বাধীন ভাবে নেওয়া হয়নি। আদালতে শেষ পর্যন্ত অধিগ্রহণকে ন্যায্য বলে বহাল রাখা হলেও আইনি নিষ্পত্তিতে বহু বছর লেগেছিল। টেসলার পরিচালকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মীমাংসায় ৬ কোটি ডলার দেওয়ার ব্যবস্থাও হয়েছিল।
সোলারসিটি-কাণ্ডের অভিজ্ঞতা থেকেই এ বার টেসলা-স্পেসএক্স সংযুক্তির প্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা রয়েছে। আলোচনায় যুক্ত একাংশের আশঙ্কা, মাস্কের প্রকাশ্য সমর্থন শেয়ারহোল্ডারদের মনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে—চুক্তির শর্ত কি দুই সংস্থার স্বার্থ বিবেচনা করে ঠিক করা হচ্ছে, নাকি মাস্কের বৃহত্তর ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে? কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এরিক ট্যালির মতে, এই ধরনের চুক্তি ঘিরে আইনি ঝুঁকির মূল প্রশ্ন হল, শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ চুক্তির শর্তে বেশি সুবিধা পাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, টেসলা এখন টেক্সাসে নিবন্ধিত সংস্থা হওয়ায় আইনি পরিস্থিতি আগের তুলনায় আলাদা হতে পারে। এই ধরনের জটিল সংযুক্তি নিয়ে টেক্সাসের আদালতের নজির সীমিত। ফলে ভবিষ্যতে কোনও মামলা হলে তার পরিণতি আগাম অনুমান করা কঠিন।
মাস্কের মন্তব্যেই কেন অস্বস্তি?
সাধারণত এ ধরনের বড় কর্পোরেট সংযুক্তির ক্ষেত্রে স্বাধীন পরিচালকদের বিশেষ কমিটি চুক্তির শর্ত খতিয়ে দেখে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধান কর্তার ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত থাকলে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ এড়ানো হয়, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। মাস্কও জানিয়েছেন, স্বার্থের সংঘাতের কারণে তিনি বিশেষ কমিটির আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন না।
কিন্তু তাঁর প্রকাশ্য মন্তব্যে সংযুক্তির পক্ষে আগাম অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কয়েক জনের উদ্বেগ বেড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এই মন্তব্যের ফলে বিনিয়োগকারীরা চুক্তির প্রতিটি শর্ত আরও খুঁটিয়ে দেখবেন। পরিচালকদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে চুক্তির প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। যদিও মাস্কের বক্তব্য নিজে থেকেই কোনও অনিয়ম প্রমাণ করে না, তবু এত বড় লেনদেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাস্ক জানিয়েছেন, টেসলার মোট শেয়ারের অন্তত ৫০ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, শুধু ভোট দিতে আসা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই হবে না—মোট শেয়ারের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে হবে বলে তাঁর বক্তব্য। এই শর্তকে তিনি নিজেই কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে দুই সংস্থার পরিচালন পর্ষদ চুক্তিতে সম্মত হলেও শেয়ারহোল্ডারদের সমর্থন নিশ্চিত করা আলাদা চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরেও আসতে পারে সংযুক্তি
দুই সংস্থার ব্যবসার চরিত্র আলাদা হওয়ায় সম্ভাব্য সংযুক্তির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ হবে। স্পেসএক্স মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নাসার সঙ্গে কাজ করে। তাদের রকেট ও মহাকাশ প্রযুক্তি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। অন্য দিকে, চিনের সাংহাইয়ে টেসলার বড় উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে এবং চিনের বাজার সংস্থাটির ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুই সংস্থা এক হলে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষা এবং চিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি অন্য দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও এই চুক্তি খতিয়ে দেখতে পারে। ফলে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন পেলেই সংযুক্তি সম্পূর্ণ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
লাভের সম্ভাবনা, ঝুঁকিও বিপুল
সমর্থকদের যুক্তি, দুই সংস্থাকে এক করা গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, চিপ উৎপাদন, শক্তি সঞ্চয় এবং উপগ্রহ যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপুল সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। টেসলার গাড়ি ও রোবটের প্রযুক্তি এবং স্পেসএক্সের মহাকাশ ও যোগাযোগ পরিকাঠামো পরস্পরকে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও গবেষণার পরিকল্পনা আরও সহজে সমন্বয় করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সংশয়ও কম নয়। দুই সংস্থার ব্যবসায়িক ঝুঁকি এক নয়। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতা, স্বয়ংক্রিয় গাড়ির প্রযুক্তি, রকেট উৎক্ষেপণ, উপগ্রহ পরিষেবা এবং মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন। এক ছাতার তলায় এলে এই ঝুঁকিগুলি কমে যাবে, এমন নয়; বরং একটি সংস্থার সমস্যার প্রভাব অন্য ব্যবসাতেও পড়তে পারে। এ ছাড়া দুই সংস্থার মূল্যায়ন কত হবে, কোন সংস্থার শেয়ারহোল্ডাররা কত অংশীদারি পাবেন এবং ভবিষ্যতে কোন ব্যবসায় কত টাকা বিনিয়োগ করা হবে—এই প্রশ্নগুলিও গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্তির ফলে মাস্কের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে, টেসলা ও স্পেসএক্সের সম্ভাব্য মহামিলন মাস্কের প্রযুক্তি সাম্রাজ্যকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। কিন্তু প্রায় ৩.৫ লক্ষ কোটি ডলারের এই পরিকল্পনা এখনও আলোচনার স্তরেই। চুক্তির কাঠামো, মূল্যায়ন, শেয়ারহোল্ডারদের সমর্থন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন—সব বাধা পেরোতে হবে। আপাতত তাই প্রশ্ন শুধু দুই সংস্থা এক হবে কি না, তা নয়; বরং এত বড় ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে মাস্কের ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে কতটা দূরে থেকে স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বজায় রাখা যায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।





