নিউজ ডেস্ক: রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি। নিয়ম করে ওষুধ খেয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফল। অথচ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে বাড়তে পারে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি। এমন রোগীদের জন্য নতুন আশার খবর আমেরিকা থেকে। স্ট্যাটিন খাওয়ার পরেও যাঁদের রক্তে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকছে, তাঁদের চিকিৎসায় নতুন একটি দৈনিক বড়ি অনুমোদন করেছে আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ। এত দিন এই ধরনের চিকিৎসায় কার্যকর বিকল্পগুলির মধ্যে ব্যয়বহুল ইঞ্জেকশনও ছিল। নতুন ওষুধটি মুখে খাওয়ার বড়ি হওয়ায় চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ওষুধটির নাম ‘লিপফেন্ড্রা’। এর সক্রিয় উপাদান এনলিসিটাইড। প্রস্তুতকারক সংস্থা মার্কের তৈরি এই ওষুধ শরীরে এমন একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা রক্ত থেকে খারাপ কোলেস্টেরল সরিয়ে ফেলতে যকৃতের স্বাভাবিক ক্ষমতাকে সীমিত করে। ওই প্রোটিনটির নাম পিসিএসকে৯। তাকে বাধা দিতে পারলে যকৃত রক্ত থেকে আরও বেশি এলডিএল কোলেস্টেরল সরিয়ে নিতে পারে। এর ফলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমতে পারে।
এত দিন পিসিএসকে৯-কে লক্ষ্য করে তৈরি চিকিৎসার বড় অংশই ছিল ইঞ্জেকশননির্ভর। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেই ইঞ্জেকশন নিতে হত রোগীদের। খরচ, চিকিৎসার সুবিধা এবং ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার কারণে অনেকের পক্ষেই সেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। নতুন বড়িটি দিনে এক বার খেতে হয়। ফলে ইঞ্জেকশনের বিকল্প হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে নতুন ওষুধটি সব রোগীর জন্য নয়। বিশেষ করে যাঁদের স্ট্যাটিন-সহ প্রচলিত চিকিৎসাতেও কোলেস্টেরল কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামছে না, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এই বিকল্প বিবেচনা করতে পারেন।
পরীক্ষায় কতটা কার্যকর নতুন ওষুধ?
আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পিছনে রয়েছে একাধিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফল। দুটি বড় পরীক্ষায় মোট ৩২০৭ জন প্রাপ্তবয়স্ককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে এমন রোগীও ছিলেন, যাঁদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেশি, আবার এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন যাঁদের বংশগত কারণে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি। অংশগ্রহণকারীরা আগে থেকেই তাঁদের সহনীয় মাত্রার স্ট্যাটিন চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার পরেও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল।
পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ২৪ সপ্তাহের চিকিৎসার পর একটি পরীক্ষায় নতুন ওষুধটি গ্রহণকারীদের এলডিএল কোলেস্টেরল প্লাসিবো বা নিষ্ক্রিয় ওষুধ গ্রহণকারীদের তুলনায় গড়ে ৫৬ শতাংশ কমেছিল। অন্য পরীক্ষায় কমার হার ছিল ৫৯ শতাংশ। এই ফল চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্ট্যাটিন খাওয়ার পরেও অনেক রোগীর রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বিপজ্জনক মাত্রায় থেকে যায়। তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিকিৎসা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।
তবে কোলেস্টেরল কমার হারকে সরাসরি হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকের ঘটনা একই অনুপাতে কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এই পরীক্ষাগুলিতে মূলত রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরলের পরিবর্তন মাপা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকিতে ওষুধটির প্রভাব কতটা, তা বোঝার জন্য আরও তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কী জানা গিয়েছে?
পরীক্ষায় ওষুধটি গ্রহণকারীদের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সামগ্রিক হার নিষ্ক্রিয় ওষুধ গ্রহণকারীদের সঙ্গে মোটামুটি তুলনীয় ছিল। তবে একটি পরীক্ষায় ডায়রিয়া ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা কিছুটা বেশি দেখা গিয়েছে। কোনও ওষুধের ক্ষেত্রেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই রোগীর বয়স, অন্যান্য অসুখ, চলতি ওষুধ এবং সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি বিচার করেই চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত চিকিৎসায় স্ট্যাটিন এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্ট্যাটিন বন্ধ করে নতুন বড়ি খাওয়া নিরাপদ নয়। কারও ক্ষেত্রে স্ট্যাটিনের মাত্রা বাড়ানো, অন্য ওষুধ যোগ করা কিংবা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হতে পারে। নতুন ওষুধের অনুমোদন মানেই পুরনো চিকিৎসা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়া নয়।
ভারতে কবে পাওয়া যাবে?
আমেরিকায় অনুমোদন মিললেও ভারতে ওষুধটি কবে পাওয়া যাবে, কত দাম হবে এবং কোন রোগীদের জন্য ব্যবহারের অনুমতি মিলবে, তা এখনও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও বাজারে বিপণনের ব্যবস্থা ছাড়া আমেরিকার অনুমোদনের ভিত্তিতে এ দেশে ওষুধটি নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহার করা যাবে না। দামও বড় বিষয়। নতুন ওষুধটি যদি ব্যয়বহুল হয়, তা হলে বহু রোগীর কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ভারতে হৃদ্রোগের ঝুঁকি, ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের সমস্যা একসঙ্গে দেখা যায় বহু মানুষের মধ্যে। তাই এলডিএল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। তবে ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান বর্জন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল, উচ্চ কোলেস্টেরলের সাধারণত কোনও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। অনেকেই রক্ত পরীক্ষা না করা পর্যন্ত সমস্যাটি বুঝতে পারেন না। তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শে কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো দরকার। নতুন ওষুধ আশার আলো দেখালেও, কার জন্য তা উপযুক্ত এবং কতটা প্রয়োজন, সেই সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।





