নয়াদিল্লি: দীর্ঘ টানাপড়েনের পরে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কের জট খুলতে শুরু করেছে? দুই দেশের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্ব চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানালেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল। বৃহস্পতিবার তাঁর বক্তব্য, চুক্তির আইনি খসড়া তৈরির কাজ চলছে। দ্রুত চূড়ান্ত করে তা কার্যকর করার আশা করছে নয়াদিল্লি। তবে চুক্তি কার্যকর করার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রতিযোগী দেশগুলির তুলনায় ভারতীয় রফতানিকারীরা যাতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন, তা নিশ্চিত করতে চায় কেন্দ্র। ফলে প্রথম পর্ব চূড়ান্ত হলেও চুক্তি স্বাক্ষর ও কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া এখনও বাকি।
দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে পীযূষ গয়াল জানান, ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্বের মূল বিষয়গুলি স্থির হয়েছে। এখন তার চূড়ান্ত রূপরেখা ও আইনি ভাষা তৈরির কাজ চলছে। বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়ালও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা সঠিক দিশায় এগোচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি চূড়ান্ত করে স্বাক্ষর করার লক্ষ্য রয়েছে দুই পক্ষের। তবে আমেরিকার সামগ্রিক শুল্ক কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে এই চুক্তির সময়সূচিও জড়িত।
ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের গোড়ায়। লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো, শুল্কজনিত বাধা কমানো এবং পরস্পরের বাজারে পণ্যের প্রবেশাধিকার আরও সহজ করা। কিন্তু শুল্কনীতি, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন পণ্যের উপর আমদানি-রফতানির শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য বারবার আলোচনাকে জটিল করেছে। আমেরিকার শুল্কনীতি ঘিরে সাম্প্রতিক টানাপড়েনও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে চাপে রেখেছে।
ভারতের কাছে এই চুক্তির গুরুত্ব যথেষ্ট। আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের অন্যতম বড় বাজার। বস্ত্র, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর পরিষেবা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্কিন বাজার ভারতীয় সংস্থাগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুল্কের হার কমলে বা স্থিতিশীল হলে ভারতীয় রফতানিকারীদের প্রতিযোগিতার সুবিধা হতে পারে। অন্য দিকে, আমেরিকার সংস্থাগুলিও ভারতের বাজারে আরও বেশি পণ্য ও পরিষেবা বিক্রির সুযোগ চাইছে। দুই দেশের আলোচনায় তাই শুধু শুল্ক কমানোর প্রশ্ন নয়, বরং কে কতটা বাজারে প্রবেশের সুবিধা পাবে, সেটিও বড় বিষয়।
চুক্তির প্রথম পর্ব চূড়ান্ত হওয়ার খবর ইতিবাচক হলেও এখনই সব বাধা কেটে গিয়েছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। পীযূষ গয়াল স্পষ্ট করেছেন, প্রতিযোগী দেশগুলির তুলনায় ভারতীয় রফতানিকারীদের সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর যে শুল্ক বসবে, তা ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ বা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী রফতানিকারী দেশগুলির পণ্যের তুলনায় কতটা সুবিধাজনক হবে, সেটিও ভারতের বিবেচনায় রয়েছে। কোনও চুক্তি স্বাক্ষর করাই শেষ কথা নয়; তার শর্ত ভারতীয় শিল্প ও রফতানির পক্ষে কতটা কার্যকর, সেটাই আসল পরীক্ষা।
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপড়েনও এই আলোচনার প্রেক্ষাপটকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। গত বছর মার্কিন শুল্কনীতি এবং ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের অবসানে মধ্যস্থতা করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। পরে মার্কিন অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন এবং এইচ-১বি ভিসার ফি বৃদ্ধির মতো সিদ্ধান্তও ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে বাণিজ্য চুক্তি শুধু রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নয়, দুই দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো ১৭ থেকে ২২ অক্টোবর ভারত ও উজবেকিস্তান সফর করবেন। এই সফরে জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। চুক্তির প্রথম পর্ব চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণার পর এই সফর দুই দেশের আলোচনায় নতুন গতি আনতে পারে। তবে সফর থেকেই চুক্তি স্বাক্ষর হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা এখনও নেই।
সব মিলিয়ে, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্ব চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা দীর্ঘ আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু আইনি খসড়া চূড়ান্ত করা, শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা এবং দুই দেশের সম্মতিতে চুক্তি স্বাক্ষর—এই ধাপগুলি এখনও বাকি। তাই আপাতত আশার ইঙ্গিত মিললেও চুক্তির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে তার চূড়ান্ত শর্তের উপর। ভারতীয় রফতানিকারীরা কতটা সুবিধা পান এবং আমেরিকার বাজারে তাঁদের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কতটা বাড়ে, সেই উত্তর মিলবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরেই।





