নয়াদিল্লি: বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটে যোগ দেওয়ার পর প্রথম বার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিল অভিনেতা-রাজনীতিক তথা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়ের দল তামিলগা ভেত্রি কাজাগম (টিভিকে)। কিন্তু জোটের মঞ্চে উপস্থিতি থাকলেও প্রতিবাদের পরিসর নিয়ে সতর্ক রইল দল। বৃহস্পতিবার চেন্নাইয়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভে টিভিকে-র তরফে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী এ রাজমোহন। বিজয় নিজে তো ছিলেনই না, দলের অন্য কোনও নেতা বা কর্মীকেও দেখা যায়নি। এমনকি সমাবেশে টিভিকে-র দলীয় পতাকাও ছিল না। ফলে বিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার পর কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিজয়ের দল ঠিক কতটা সক্রিয় হবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
চেন্নাইয়ের এগমোর এলাকার রামাদা সার্কল, ল্যাঙ্গস গার্ডেন রোডে আয়োজিত এই কর্মসূচির নাম ছিল ‘গণতন্ত্র রক্ষা’। তামিলনাড়ু কংগ্রেস কমিটির সভাপতি বি মণিকম ঠাকুরের নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভে কংগ্রেসের পাশাপাশি যোগ দিয়েছিল বিদুথালাই চিরুথাইগল কাচি (ভিসিকে), মারুমালার্চি দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগম (এমডিএমকে), সিপিএম, সিপিআই, সিপিআই (এমএল) এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মূল দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরাতে হবে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়েও সরব হন বিরোধী নেতারা।
৩ অক্টোবর কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটে যোগ দিয়েছিল টিভিকে। তার পর এই প্রথম নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জোটের কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিল দলটি। কিন্তু বিজয়ের অনুপস্থিতি এবং মাত্র এক জন মন্ত্রীর উপস্থিতি জোটের অন্দরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে। রাজমোহন অবশ্য বক্তৃতায় এসআইআর-এর তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, এই সংশোধন প্রক্রিয়া দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলে থাকার সময় যেমন এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছে টিভিকে, ক্ষমতায় এসেও তাদের অবস্থান বদলায়নি বলেই দাবি করেন তিনি।
রাজমোহনের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রথম পর্যায়ে তামিলনাড়ুতে প্রায় ৯৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনা তাঁদের উদ্বিগ্ন করেছে। এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দল প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার জন্য আইনজীবীদের সাহায্য নিয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, মহিলা, ৩০ বছরের কম বয়সি ভোটার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ এবং প্রথম বার ভোট দিতে চলা নাগরিকদের উপর এই প্রক্রিয়ার প্রভাব বিশেষ ভাবে পড়েছে। নাম বাদ না গেলে তামিলনাড়ুতে টিভিকে আরও বেশি আসনে জিততে পারত বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। সংবিধান প্রণেতা বি আর আম্বেডকরের গণতন্ত্র-সংক্রান্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করে রাজমোহন বলেন, ভোটাধিকার কেবল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নয়, নাগরিকের মর্যাদার সঙ্গেও তা জড়িত। মঞ্চে উপস্থিত প্রবীণ বিরোধী নেতাদের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তাঁরা যেন টিভিকে-কে পথ দেখান। কংগ্রেসের সঙ্গে দলের রাজনৈতিক সমঝোতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু বক্তৃতায় নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা থাকলেও বিজেপির নাম এক বারও উচ্চারণ করেননি রাজমোহন।
বিজয়ের এই সতর্ক অবস্থানের পিছনে তামিলনাড়ুর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিধানসভা নির্বাচনের পর কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গড়েছে টিভিকে। তবে বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকারকে শরিকদের সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্য দিকে, বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র শরিক এআইএডিএমকে-র বিধায়কদের টিভিকে-তে টানার চেষ্টা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগগুলি স্বাধীন ভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে বিরোধী শিবিরের কয়েক জন নেতার মতে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিজয়ের সতর্কতার পিছনে এই রাজনৈতিক সমীকরণও কাজ করতে পারে। বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার জেরে। ১০ অক্টোবর চেন্নাইয়ে বিজয়ের নীলাঙ্করাইয়ের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তার পরের দিনই চেন্নাইয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে স্বাগত জানান বিজয়। মেট্রো প্রকল্পের উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যাত্রা, মন্দিরে যাওয়া এবং সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে জাতীয় রাজনীতির দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের নেতাদের সঙ্গে বিজয়ের যোগাযোগ রাজনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে, তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসের পুরনো শরিক দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগম (ডিএমকে) ১২ অক্টোবর ইন্ডিয়া জোট ছাড়ার কথা ঘোষণা করে। টিভিকে-র সঙ্গে কংগ্রেসের জোটকে কেন্দ্র করে ডিএমকে-কংগ্রেস সম্পর্কের টানাপড়েন আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে রাজ্যে বিরোধী রাজনীতির সমীকরণও বদলাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে টিভিকে-র জোটে যোগ দেওয়া কংগ্রেসের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বিজয় কতটা সরাসরি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরোধিতায় নামবেন, সেই প্রশ্ন এখনও খোলা। বিক্ষোভের শেষে রাজমোহন এসআইআর-এর বিরোধিতা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু জোটের কর্মসূচিতে দলের সীমিত উপস্থিতি এবং বিজেপির নাম এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইন্ডিয়া জোটে যোগ দেওয়াই যে সব বিষয়ে একই মাত্রায় রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার নিশ্চয়তা নয়। আপাতত ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সমর্থন জানালেও, কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নে বিজয়ের দল কত দূর এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেল।





