নয়াদিল্লি, নিউজ ডেস্ক: বর্ষা মানেই ইনফ্লুয়েঞ্জার বাড়বাড়ন্ত। তার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফের বাড়ছে Influenza A (H1N1)-এর সংক্রমণ। দিল্লি-সহ একাধিক শহরে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মহারাষ্ট্র, কর্নাটক এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকেও সংক্রমণের খবর এসেছে। পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে জরুরি পরামর্শ জারি করল ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (IMA)। তবে একই সঙ্গে চিকিৎসকদের আশ্বাস—আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা।
IMA-র বক্তব্য, বর্তমানে দেশে যে H1N1 ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, সেটি মূলত মরসুমি Influenza A। ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (ICMR)-এর নজরদারিতে এখনও পর্যন্ত ভাইরাসটির কোনও নতুন বা অস্বাভাবিক জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নতুন কোনও ‘সুপার ভাইরাস’ ছড়িয়ে পড়েছে—এমন তথ্য নেই। অধিকাংশ আক্রান্তের ক্ষেত্রেই সংক্রমণ মৃদু থাকে এবং সময়ের সঙ্গে সেরে যায়।
তবে বিপদ অন্য জায়গায়। সাধারণ ফ্লু-এর মতো শুরু হলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই জ্বর-কাশিকে হালকা ভাবে না দেখে লক্ষণগুলির দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছে চিকিৎসক সংগঠনটি।
কী ভাবে চিনবেন H1N1?
অনেক সময় আচমকাই শুরু হয় জ্বর। সঙ্গে কাঁপুনি, শুকনো কাশি, গলা ব্যথা, শরীরের পেশিতে তীব্র ব্যথা এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি। মাথাব্যথা হতে পারে। নাক দিয়ে জল পড়া, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে ছবিটা আরও কিছুটা আলাদা হতে পারে—বমি, বমি বমি ভাব কিংবা পাতলা পায়খানাও হতে পারে।
কিন্তু জ্বরের সঙ্গে কোন লক্ষণটি দেখা দিলে আর বাড়িতে বসে থাকা চলবে না?
IMA-র পরামর্শ, শ্বাস নিতে কষ্ট বা হাঁপ ধরা শুরু হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুকে ব্যথা, বুকে লাগাতার চাপ অনুভব হওয়া, কাশির সঙ্গে রক্ত ওঠা কিংবা ঠোঁট ও আঙুল নীলচে হয়ে যাওয়া—সবই গুরুতর সতর্কসংকেত। এমন কোনও লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়াই নিরাপদ।
এ ছাড়াও অস্বাভাবিক তন্দ্রা, কথা বা আচরণে বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত ঘুম, খিঁচুনি, বার বার বমি কিংবা মুখে জল পর্যন্ত রাখতে না পারাও বিপদের ইঙ্গিত। শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। দুধ বা খাবার খেতে না পারা, অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়া, শ্বাস নেওয়ার সময় গোঁ-গোঁ শব্দ হওয়া কিংবা শ্বাস নেওয়ার সময়ে বুকের অংশ ভিতরে ঢুকে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
‘জ্বর হয়েছে, তাই অ্যান্টিবায়োটিক’—এই ধারণাতেই আপত্তি IMA-র।
H1N1 ভাইরাসজনিত অসুখ। তাই জ্বর, সর্দি, কাশি হলেই নিজের মতো করে Azithromycin, Amoxicillin-Clavulanate বা Cefixime খাওয়া শুরু করা উচিত নয়। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। বরং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে শরীরের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-এর সমস্যা বাড়ে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ নাও করতে পারে।
কোনও রোগীর ক্ষেত্রে H1N1-এর পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হয়েছে বলে চিকিৎসকের সন্দেহ হলে তবেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে। সেই সিদ্ধান্ত নেবেন চিকিৎসক, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে।
একই সতর্কতা Oseltamivir-এর ক্ষেত্রেও। H1N1-এ ব্যবহৃত এই অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রেসক্রিপশন-ভিত্তিক। পরিচিত কারও পরামর্শে বা পুরনো প্রেসক্রিপশন দেখে নিজে থেকে এই ওষুধ শুরু না করার পরামর্শ দিয়েছে IMA।
সংক্রমণ এড়াতে অবশ্য খুব সাধারণ কিছু অভ্যাসই বড় ভূমিকা নিতে পারে। নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময়ে মুখ-নাক ঢেকে রাখা এবং ভিড় বা বদ্ধ জায়গায় যথাযথ মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে IMA। জ্বর বা ফ্লু-জাতীয় উপসর্গ থাকলে বাড়িতে থাকা উচিত। স্কুল, অফিস কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে না গিয়ে অন্তত জ্বর কমানোর ওষুধ ছাড়াই ২৪ ঘণ্টা জ্বরমুক্ত থাকার পর অন্যদের সংস্পর্শে ফেরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন অন্তঃসত্ত্বা, বয়স্ক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে। এই ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলির জন্য প্রতি বছর মরসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়ার উপরও জোর দিয়েছে IMA।
ফলে চিকিৎসকদের বার্তা স্পষ্ট, H1N1 নিয়ে আতঙ্কের প্রয়োজন নেই, কিন্তু অবহেলাও নয়। সাধারণ ফ্লু-এর মতো উপসর্গ হলে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল এবং চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। আর শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, নীলচে ঠোঁট, রক্ত ওঠা বা অস্বাভাবিক তন্দ্রার মতো বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে পৌঁছনোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়। লক্ষণ বুঝুন, ঝুঁকি বুঝুন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন—H1N1 মোকাবিলায় আপাতত এটাই IMA-র মূল বার্তা।