হরমুজ: সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে হঠাৎ যদি জালে ওঠে দামি আইফোন আর ফরাসি সুগন্ধির বাক্স, তা হলে কেমন হবে? এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হরমুজ প্রণালী। সমুদ্রে ডুবে যাওয়া একটি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বিপুল পরিমাণ পণ্য। আর সেই খবর ছড়াতেই ছোট ছোট নৌকা নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটেছেন শত শত ইরানি মৎস্যজীবী। তাঁদের লক্ষ্য, সমুদ্রের জলে ভাসতে থাকা আইফোন, দামি পারফিউম এবং অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, আধডোবা কন্টেনারের আশপাশে নৌকা নিয়ে ঘুরছেন একাধিক ব্যক্তি। কেউ জল থেকে বাক্স টেনে তুলছেন, কেউ আবার গোটা কন্টেনারই টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘জিএফএস প্রাইড’। গত ১৪ অক্টোবর আগুন লাগার পর জাহাজটি ডুবে যায়। জাহাজটিতে ২,৫০০-রও বেশি কন্টেনার ছিল বলে জানা গিয়েছে। সেগুলিতে কী কী পণ্য ছিল, তার সবিস্তার হিসাব এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সমুদ্রে ভাসতে থাকা বাক্স থেকে আইফোন এবং ফরাসি সুগন্ধি উদ্ধারের ভিডিয়ো সামনে আসার পর ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, তাঁরা হরমুজ প্রণালীর দিকে রওনা হয়েছেন। একটি কন্টেনারবাহী জাহাজ ডুবে গিয়েছে এবং সেখানে আইফোন ও সুগন্ধি পাওয়া যেতে পারে—এই খবর পেয়েই তাঁরা সমুদ্রে নেমেছেন। অন্য একটি ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, কয়েক জন মৎস্যজীবী আধডোবা কন্টেনারের পাশ থেকে বাক্স টেনে তুলছেন। একটি ছোট নৌকাকে গোটা কন্টেনার টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেও দেখা গিয়েছে। তবে উদ্ধার করা পণ্যগুলি শেষ পর্যন্ত কারা নিজেদের দখলে রেখেছেন, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সামনে আসেনি।
জাহাজটি কী ভাবে ডুবল, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সিঙ্গাপুরের তরফে জানানো হয়েছে, জাহাজে আগুন লাগার পর সেটি ডুবে যায়। জাহাজের ২১ জন কর্মীকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের কারও আহত হওয়ার খবর নেই। ফলে জাহাজডুবির ঘটনায় প্রাণহানির খবর না থাকলেও বিপুল পরিমাণ পণ্য সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্য দিকে, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র নৌবাহিনীর দাবি, অনুমোদনহীন ও বিপজ্জনক পথে যাওয়ার সময় জাহাজটি সমুদ্রের তলায় থাকা মাইনে ধাক্কা খায়। তার পরেই আগুন লাগে এবং জাহাজটি ডুবে যায় বলে দাবি ইরানের। তবে জাহাজডুবির প্রকৃত কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য এক নয়। স্বাধীন তদন্তের ফল সামনে না আসা পর্যন্ত মাইন বিস্ফোরণই দুর্ঘটনার কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। জাহাজ চলাচলের উপর বিধিনিষেধ, হামলার আশঙ্কা এবং সামুদ্রিক পথের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে জিএফএস প্রাইডের ডুবে যাওয়া নতুন করে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
জাহাজডুবির পর সমুদ্রে ভাসতে থাকা কন্টেনার উদ্ধার করতে গিয়ে মৎস্যজীবীদের জন্যও বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। ভাসমান কন্টেনার যে কোনও সময় সরে যেতে পারে বা ডুবে যেতে পারে। সমুদ্রের স্রোত, ঢেউ এবং অজানা পণ্যের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইরানের নৌবাহিনী স্থানীয় মৎস্যজীবীদের ভাসমান কন্টেনারের আশপাশে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে, সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া পণ্যের মালিকানা ও বিমার দাবি কী ভাবে নিষ্পত্তি হবে? জাহাজের মালিক, পণ্য পরিবহণকারী সংস্থা, বিমা সংস্থা এবং পণ্যের মালিকদের মধ্যে দায় ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সমুদ্র থেকে পণ্য উদ্ধার করলেই তা উদ্ধারকারীদের সম্পত্তি হয়ে যায় না; সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং সামুদ্রিক নিয়ম অনুযায়ী তার নিষ্পত্তি নির্ধারিত হবে।
মাছের বদলে সমুদ্র থেকে আইফোন আর দামি সুগন্ধি পাওয়ার ঘটনা শুনতে যতই অবিশ্বাস্য লাগুক, এর পিছনে রয়েছে একটি বড় সামুদ্রিক দুর্ঘটনা এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি। জাহাজের কর্মীরা প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, কিন্তু হাজার হাজার কন্টেনার নিয়ে জাহাজডুবির ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রে ভাসতে থাকা পণ্য কুড়োতে নৌকা নিয়ে ছুটে যাওয়া মৎস্যজীবীদের ভিডিয়ো তাই কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়—যুদ্ধের আবহে বিপজ্জনক জলপথে বাণিজ্য ও মানুষের জীবিকা কতটা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, তারও ছবি।





