বিশেষ প্রতিবেদন: কখনও ‘আমফান’, কখনও ‘ইয়স’, আবার কখনও ‘আইলা’ কিংবা ‘বুলবুল’ বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলেই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ভেসে ওঠে নানা নাম। সেই নাম ঘিরেই বাড়তে থাকে উদ্বেগ, শুরু হয় প্রশাসনিক তৎপরতা। উপকূলবর্তী এলাকায় জারি হয় সতর্কতা, চলে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, ঘূর্ণিঝড়ের এমন নামকরণ করা হয় কেন? কে ঠিক করেন এই নাম? কীভাবেই বা নির্ধারিত হয় কোন ঝড়ের নাম কী হবে?
আসলে, ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের পিছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একাধিক দেশ এবং আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা।
কেন নাম দেওয়া হয় ঘূর্ণিঝড়ের?
একই সময়ে একাধিক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে সেগুলিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা এবং দ্রুত সতর্কবার্তা প্রচার করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু ভৌগোলিক অবস্থান, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ কিংবা আবহাওয়াগত তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিটি ঝড়ের পরিচয় স্পষ্ট করা কঠিন হতে পারে।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট নামের মাধ্যমে আবহাওয়াবিদ, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সহজেই সংশ্লিষ্ট ঝড়টিকে শনাক্ত করতে পারেন। ফলে সতর্কবার্তা প্রচার, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় অনেক সহজ হয়।
নামকরণের নেপথ্যে ১৩টি দেশ
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় ভারত-সহ মোট ১৩টি দেশ অংশগ্রহণ করে। দেশগুলি হল
১. বাংলাদেশ
২. ভারত
৩. ইরান
৪. মালদ্বীপ
৫. মায়ানমার
৬. ওমান
৭. পাকিস্তান
৮. কাতার
৯. সৌদি আরব
১০. শ্রীলঙ্কা
১১. থাইল্যান্ড
১২. সংযুক্ত আরব আমিরশাহি
১৩. ইয়েমেন
এই দেশগুলি আগে থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের জন্য বিভিন্ন নাম প্রস্তাব করে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ESCAP)-এর আঞ্চলিক ব্যবস্থার অধীনে এই নামের তালিকা প্রস্তুত ও অনুমোদিত হয়।
এরপর নির্ধারিত ক্রম অনুসারে একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়। অর্থাৎ, কোনও দেশ নিজের ইচ্ছেমতো একটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করে দিতে পারে না। আগে থেকে অনুমোদিত তালিকা অনুসরণ করেই নাম নির্ধারণ করা হয়।
নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলি মাথায় রাখা হয়?
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা হয়।
১. সহজ ও সংক্ষিপ্ত নাম: নামটি যেন সহজে উচ্চারণ করা যায় এবং মনে রাখা সম্ভব হয়।
২. আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য: নামের অর্থ বা ব্যবহার যেন কোনও দেশের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি কিংবা মানুষের অনুভূতিতে আঘাত না করে।
৩. নিরপেক্ষতা: নামটি যেন অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত না হয়।
৪. স্বতন্ত্র পরিচয়: নামটি যেন অন্য কোনও নামের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি না করে এবং সহজেই শনাক্ত করা যায়।
কখন ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়?
বঙ্গোপসাগর বা আরব সাগরে নিম্নচাপ তৈরি হলেই তার নামকরণ করা হয় না। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনও ঘূর্ণিঝড়ের সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩৪ নট বা প্রায় ৬৩ কিলোমিটারে পৌঁছলে তাকে নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী নাম দেওয়া হয়।
একবার কোনও ঘূর্ণিঝড়ের নাম নির্ধারিত হলে তার গতিপথ পরিবর্তন বা শক্তি বাড়া-কমার কারণে সাধারণত নাম বদলানো হয় না। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবহৃত কোনও নাম পুনরায় ব্যবহার করা হয় না। তবে অত্যন্ত প্রাণঘাতী বা ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের নাম ভবিষ্যতে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।
কোন ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়েছিল কোন দেশ?
ঘূর্ণিঝড়ের নাম শুনে অনেকেই জানতে চান, সেই নামটি কোন দেশের প্রস্তাবিত। উদাহরণ হিসেবে
- আইলা (২০০৯): মালদ্বীপের প্রস্তাবিত নাম।
- বুলবুল (২০১৯): পাকিস্তানের প্রস্তাবিত নাম।
- আমফান (২০২০): থাইল্যান্ডের প্রস্তাবিত নাম।
- ইয়স (২০২১): ওমানের প্রস্তাবিত নাম।
- রেমাল (২০২৪): ওমানের প্রস্তাবিত নাম।
প্রতিটি নামের পিছনেই রয়েছে অনুমোদিত তালিকা এবং নির্ধারিত ক্রম। তাই কোনও ঝড়ের নাম শুনেই ধরে নেওয়া যায় না যে সেটি ওই দেশেই তৈরি হয়েছে। নাম প্রস্তাবকারী দেশ এবং ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তিস্থল সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
ঘূর্ণিঝড়ের নামের চেয়েও জরুরি সতর্কতা
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে একাধিক ঘূর্ণিঝড় মানুষের জীবন, জীবিকা এবং সম্পত্তির উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রতিটি ঝড়ের নাম আলাদা হলেও দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্ব একই,সময়মতো সতর্কতা, নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস এবং প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের প্রস্তুতি।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ তাই নিছক নাম দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক সমন্বয়, দ্রুত যোগাযোগ এবং মানুষের জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দিক। ঝড়ের নাম জানা যেমন কৌতূহলের বিষয়, তার চেয়েও বেশি জরুরি আবহাওয়া দফতরের সতর্কবার্তা মেনে চলা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া এবং দুর্যোগের সময় নিরাপদ স্থানে থাকা।




