নয়াদিল্লি: আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাউদ ইব্রাহিমের অবস্থান নিয়ে ফের সরব হল ভারত। রাষ্ট্রপুঞ্জের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিশেষ রিপোর্টে দাউদকে ‘ভারত-ভিত্তিক’ ডি-কোম্পানি অপরাধচক্রের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই বক্তব্যের বিরোধিতা করে ভারতের দাবি, রিপোর্টে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যথাযথ ভাবে তুলে ধরা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, তথ্যগত ভুলের জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ রিপোর্টদাতাদের জবাবদিহি থাকা উচিত বলেও দাবি করেছে নয়াদিল্লি। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে ভারতের হয়ে বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের স্থায়ী মিশনের প্রথম সচিব রাঘু পুরী। তিনি বলেন, দাউদ ইব্রাহিমকে নিয়ে রিপোর্টে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সম্পূর্ণ প্রতিফলন নয়। ভারতের বক্তব্য, দাউদকে শুধু একটি অপরাধচক্রের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করলে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের অভিযোগের গুরুত্ব আড়ালে থেকে যায়।
১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণের প্রসঙ্গ তুলল ভারত
রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ রিপোর্টদাতা বেন সাউল তাঁর জুলাইয়ের রিপোর্টে দাউদকে ‘ভারত-ভিত্তিক’ ডি-কোম্পানির নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ২০০৩ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ ডি-কোম্পানির নেতাকে আল কায়দার সঙ্গে যোগসূত্রের কারণে তালিকাভুক্ত করে। এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাঘু পুরী বলেন, বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, দাউদ এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন অপরাধচক্র ১৯৯৩ সাল থেকেই ভারতে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার অধীনে তালিকাভুক্তির কারণ ব্যাখ্যা করা নথিতেও সেই তথ্য রয়েছে বলে দাবি ভারতের। ভারতের মতে, ২০০৩ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের তালিকায় নাম ওঠার অনেক আগেই দাউদ ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। বিদেশে অবস্থানকালে আল কায়দা এবং ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রের অভিযোগ সামনে আসে। সেই প্রেক্ষাপট যথাযথ ভাবে উল্লেখ না করে তাঁকে ‘ভারত-ভিত্তিক’ অপরাধচক্রের নেতা হিসেবে তুলে ধরা বিভ্রান্তিকর বলে মনে করছে নয়াদিল্লি।
‘যে দেশে ওসামাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, সেখানেই দাউদ’
দাউদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাঘু পুরী বলেন, তিনি এখনও ভারতের ওয়ান্টেড অপরাধী। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত তালিকায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দাউদ সেই দেশেই রয়েছেন, যেখানে একসময় ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল এবং মার্কিন বাহিনীর অভিযানে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। এখানে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদের প্রসঙ্গ টেনেছে ভারত। ২০১১ সালে পাকিস্তানের ওই শহরের একটি সুরক্ষিত এলাকায় গোপন আস্তানা থেকে ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে পায় মার্কিন বাহিনী। সেখানেই অভিযান চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। ভারতের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দাউদ পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালের মুম্বই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ-সহ একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ওই বিস্ফোরণে ২৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির অভিযোগ, বিস্ফোরণের ষড়যন্ত্রে দাউদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে দাউদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ভারতের দাবি এবং পাকিস্তানের সরকারি অবস্থান এক নয়। অতীতে পাকিস্তান বারবার সে দেশে দাউদের থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে তাঁর অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে রিপোর্টে ভুল, রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
দাউদকে নিয়ে তথ্যগত অসংগতির অভিযোগ তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ রিপোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাঘু পুরী। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে ভুল তথ্য থাকলে তা সদস্য দেশগুলির কাছে বিভ্রান্তিকর বার্তা পৌঁছে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসবাদে মদতদাতারা নিজেদের কাজের সাফাই দিতে কখনও কখনও মানবাধিকার এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার কাঠামোকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মানবাধিকারের কাঠামো সন্ত্রাসবাদী বা উগ্রপন্থা ছড়ানো ব্যক্তিদের আড়াল করার হাতিয়ার হতে পারে না। সন্ত্রাসবাদকে কোনও ভাবেই ন্যায্যতা দেওয়া যায় না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ রিপোর্টদাতারা স্বাধীন ভাবে কাজ করেন। তাঁরা সরাসরি রাষ্ট্রপুঞ্জের কর্মী হিসেবে বেতন পান না। তাঁদের রিপোর্টে তথ্যগত ভুল বা পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে তার দায় কী ভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নই এ বার সামনে এনেছে ভারত।
পাকিস্তানের বক্তব্যকেও পাল্টা জবাব
রাষ্ট্রপুঞ্জের ওই মঞ্চে পাকিস্তানের প্রতিনিধির বক্তব্যেরও বিরোধিতা করেছে ভারত। জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে ফের জানিয়ে দেন রাঘু পুরী। পাকিস্তানের বক্তব্যকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে করা প্রচার বলে কটাক্ষ করেন তিনি। দাউদ ইব্রাহিমকে ঘিরে ভারতের এই আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয়—রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ইতিহাস কতটা নির্ভুল ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে তথ্যগত ভুলের দায় কী ভাবে নির্ধারিত হবে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। তাই রিপোর্টের নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে ভারত।





