নয়াদিল্লি: ভারতের তেল আমদানির মানচিত্র কি বদলাতে চাইছে আমেরিকা? রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার পরিমাণ বাড়াতে নয়াদিল্লির উপর চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োর সাম্প্রতিক ভারত সফর এবং গুজরাতের জামনগরে রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ়ের বিশাল তেল শোধনাগার পরিদর্শন ঘিরে সেই জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। কিন্তু আমেরিকার ইচ্ছা থাকলেই কি ভারত বিপুল পরিমাণে ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে পারবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এত সহজ নয়। তেলের ধরন, শোধনাগারের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, জাহাজভাড়া এবং বাণিজ্যিক লাভের হিসাব—সব মিলিয়ে রয়েছে একাধিক বাধা।
রুবিয়ো চাইছেন, ভেনেজুয়েলায় তেলের উৎপাদন বাড়লে সেই তেলের জন্য ভারতকে আরও বড় বাজার হিসেবে গড়ে তোলা হোক। বিশেষ করে রিলায়্যান্সের জামনগর শোধনাগারকে ঘিরে আগ্রহ বেশি। বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানে অবস্থিত তেল শোধনাগার কমপ্লেক্সগুলির অন্যতম এই কেন্দ্রের দৈনিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা প্রায় ১৪ লক্ষ ব্যারেল। ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ তেল পরিশোধনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও রয়েছে সেখানে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার পরিমাণ বাড়াতে রিলায়্যান্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু ভারতের তেল আমদানির হিসাব শুধু রাজনৈতিক সমীকরণে চলে না। কোন দেশ থেকে কত দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা পরিশোধন করতে কত খরচ হচ্ছে, পরিবহণে কত টাকা লাগছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই তেল থেকে কতটা লাভ হচ্ছে—এই সব প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে আমদানির সিদ্ধান্ত। সেই কারণেই ভেনেজুয়েলার তেল কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়ানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
তেলের ধরনেই প্রথম বাধা
ভেনেজুয়েলার প্রধান অপরিশোধিত তেল ‘মেরেই’ অত্যন্ত ভারী এবং তাতে সালফারের পরিমাণ বেশি। এই ধরনের তেল থেকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তৈরি করতে বিশেষ প্রযুক্তি ও জটিল পরিশোধন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। সব শোধনাগারে সেই পরিকাঠামো নেই। জামনগরের মতো অত্যাধুনিক শোধনাগার এই তেল প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম হলেও ভারতের অন্যান্য শোধনাগার একই পরিমাণে তা ব্যবহার করতে পারবে না।
ভারতের বহু শোধনাগার মূলত পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাশিয়ার তেল ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে বা নিজেদের পরিকাঠামো সেই অনুযায়ী সাজিয়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে রাশিয়ার তেলকে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা সহজ নয়। রাশিয়ার ‘উরালস’ এবং ভেনেজুয়েলার ‘মেরেই’-এর বৈশিষ্ট্যও এক নয়। একটি শোধনাগার নির্দিষ্ট ধরনের তেল প্রক্রিয়াকরণে দক্ষ হলেই যে অন্য ধরনের তেল সমান দক্ষতায় পরিশোধন করতে পারবে, এমন নয়।
ছাড় আছে, কিন্তু জাহাজভাড়ার ধাক্কা
ভেনেজুয়েলার তেলের আর একটি বড় সমস্যা পরিবহণ খরচ। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের তুলনায় মেরেই তেল ব্যারেলপিছু প্রায় ২৫ ডলার কম দামে পাওয়া যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের অনুমান। কাগজে-কলমে এই ছাড় আকর্ষণীয়। কিন্তু ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের পশ্চিম উপকূলে তেল আনতে জাহাজভাড়া ব্যারেলপিছু প্রায় ৩৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে দামের ছাড়ের সুবিধা পরিবহণ খরচেই কার্যত মুছে যেতে পারে।
দূরত্ব বেশি হওয়ায় জাহাজের আকার, পরিবহণের সময়, বিমা এবং অন্যান্য খরচও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে তেল আনতে ভারতের তুলনায় কম সময় ও খরচ লাগে। ইরাকের মতো দেশ থেকে ভারী তেল পাওয়ার সুযোগ থাকায় ভেনেজুয়েলার তেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ে। অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলার তেল সস্তা দেখালেই তা ভারতের জন্য সবচেয়ে লাভজনক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইতিমধ্যেই বেড়েছে আমদানি
তবে ভেনেজুয়েলার তেল থেকে ভারত পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে রয়েছে, এমন নয়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর ভারত বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ভেনেজুয়েলা থেকে আমদানিও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে এই আমদানি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল, সেখানে অগস্টে তা দৈনিক প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছিল। সেপ্টেম্বরে তা কমে দৈনিক প্রায় ২ লক্ষ ব্যারেল হয়। অক্টোবরে নির্ধারিত জাহাজগুলি সময়মতো পৌঁছলে আমদানি আরও বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
ভারতের ভেনেজুয়েলার তেল কেনার ক্ষেত্রে রিলায়্যান্সের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে অগস্টের মধ্যে ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ৩৫৮ কোটি ৫৬ লক্ষ ডলারের অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে বলে একটি শিল্প-সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রায় ৭৪ শতাংশের বেশি এসেছে রিলায়্যান্সের মাধ্যমে। ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম এবং নায়ারা এনার্জিও তুলনামূলক কম পরিমাণে এই তেল আমদানি করেছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, ভেনেজুয়েলার তেলের বাজার ভারতে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে আমদানি আরও বাড়ানোর সুযোগ কতটা, তা নির্ভর করছে শোধনাগারের ক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক লাভের উপর।
রাশিয়ার তেলের বিকল্প কি ভেনেজুয়েলা?
আমেরিকার চাপের পিছনে রয়েছে আরও বড় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমের বহু দেশ রাশিয়ার তেল কেনা কমিয়ে দেওয়ায় ভারত ছাড়ে পাওয়া রুশ অপরিশোধিত তেলের বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী। ফলে রুশ তেলের উপর নির্ভরতা কমানোর মার্কিন আগ্রহের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির উদ্যোগের যোগ রয়েছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল রাশিয়ার সরবরাহের পূর্ণ বিকল্প হতে পারবে না। ভারতের তেল আমদানির পরিমাণ বিপুল, আর বিভিন্ন শোধনাগারের চাহিদাও আলাদা। ভেনেজুয়েলার তেল বাড়তি একটি উৎস হতে পারে, কিন্তু রাশিয়া থেকে আসা বিপুল পরিমাণ তেল এক ধাক্কায় সরিয়ে তার জায়গায় এই তেল নিয়ে আসা বাস্তবসম্মত নয়।
ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা কমাতে বললেও আমেরিকা নিজেও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন দেশের তেলের বাজার নিয়ে হিসাব করছে। বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে গেলে শুধু ভারত নয়, আমেরিকাতেও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের নীতি ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় রাখার চেষ্টাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল কেনার পরিমাণ বাড়ানো এবং রাশিয়ার তেল কেনা কমানো—এই দু’টি বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। ভারত নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা, দাম ও সরবরাহের নিশ্চয়তা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে। আমেরিকার প্রস্তাব থেকে সুবিধা নিতে হলে তেলের দাম, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ, বিনিয়োগের শর্ত এবং বাণিজ্যিক লাভের বিষয়ে স্পষ্ট সমঝোতা প্রয়োজন।
ভারতের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারী দেশ। তাই একটি উৎসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প সরবরাহের পথ খোলা রাখা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উৎসের সংখ্যা বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে, যে কোনও দেশ থেকে যে কোনও পরিমাণ তেল কেনা সম্ভব।
ভেনেজুয়েলার তেল ভারতের আমদানির ঝুলিতে জায়গা বাড়াতে পারে, বিশেষত জামনগরের মতো শোধনাগারের মাধ্যমে। কিন্তু তেলের গুণমান, দূরত্ব, পরিবহণ খরচ এবং অন্য উৎস থেকে পাওয়া তেলের সঙ্গে দামের তুলনা—সব কিছুর হিসাব না কষে আমদানি বাড়ালে লাভের বদলে খরচই বাড়তে পারে।
তাই ওয়াশিংটনের প্রস্তাবে ভারতের সামনে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বাস্তব সীমাবদ্ধতা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হওয়া উচিত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ—শুধু ভূ-রাজনৈতিক চাপ নয়।





