মুর্শিদাবাদ, রেশমি ব্যানার্জি: সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ভাইরাল ইকবাল। মুর্শিদাবাদের ইকবালকে কমবেশি এখন প্রায় অনেকেই চেনেন। তার এই বিরল রোগের কথা জানেন প্রায় সকলেই। বর্তমানে মুম্বাইয়ে চিকিৎসাধীন তিনি। তবে শুধু ইকবালই নয়, একই সমস্যায় রয়েছেন তার জেঠতুতো দিদি ও বোনেরা। শুনে কিছুটা অবাক মনে হলেও বাস্তবে
ইকবালের মতই একই সমস্যার মধ্যে ভুগতে হচ্ছে তার দিদিদের।
ইকবাল হোসেনের পুকুরে ভেসে থাকার দৃশ্য ভাইরাল হতেই একটি বহুজাতিক সংস্থা তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে মুম্বাই-এ। কিন্তু একই সমস্যায় রয়েছেন তার পরিবারের আরও তিন জনের। গায়ে অসহ্য জ্বালা, আর সেই যন্ত্রণার আগুনে প্রলেপ দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের জলেই শরীর ডুবিয়ে বসে থাকছেন তিন বোন তৌফিকা, নাসরিন ও তানিয়া। ইকবালের মতো তাঁরা প্রচারের আলো পাননি, তাই জোটেনি মুম্বইয়ের টিকিটও। তাই এখনো রোজ তাদের ঠিকানা পুকুর। সেখানেই জলে ডুবে থেকে নিজেদের রোগের সাময়িক নিরাময়ের রাস্তা খুঁজে নিচ্ছেন তারা।
আর মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার বড়ুয়া ফরাজিপাড়া গ্রামে এই তিন অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে এখন চিন্তিত মা গুলশন বেওয়া। রীতিমতো মেয়েদেরকে নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত।
চার বছর আগে স্বামী মুরসালিম মারা যাওয়ার পর থেকেই সংসারের রাশ একা গুলশনের কাঁধে। এক বেসরকারি মাদ্রাসায় পরিচারিকার কাজ করে মাসে জোটে মোটে তিন হাজার টাকা। সেই সামান্য আয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে তিন মেয়ের চিকিৎসা চালাবেন কী ভাবে ? তা ভেবেই দিশেহারা তিনি। কিন্তু প্রতিনিয়ত মেয়েদের সমস্যা বেড়েই চলেছে। তাই কোনও উপায়ই খুঁজে পাচ্ছি না তিনি।
এ বিষয়ে গুলশন জানান, ছোটবেলায় তিন মেয়েই ছিল একদম স্বাভাবিক। কিন্তু বয়স ১০-১২ পেরোতেই শুরু হয় অস্বাভাবিক স্থূলতা। আজ তিনজনেরই ওজন একশো কেজি ছাড়িয়েছে, সঙ্গে শুরু হয়েছে সারা গায়ে তীব্র জ্বালাপোড়া। সেই জ্বালা জুড়োতেই ভোর থেকে পুকুরে ডুব, বহু সময় রাত নামলেও জল থেকে উঠতে চান না তাঁরা। দিনভর ঘন ঘন স্নান আর ফ্রিজের ঠান্ডা জল খাওয়ার জেরে তিন বোনেরই এখন স্থায়ী সঙ্গী হয়েছে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট। ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে অক্সিজেন ও ইনজেকশন দিয়ে বার বার তাঁদের বাড়ি ফিরিয়ে আনতে হয়।
শারীরিক এই মরণযন্ত্রণা অকালেই কেড়ে নিয়েছে তাঁদের পড়াশোনা। বড় মেয়ে বছর বাইশের তৌফিকা মাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ হয়ে পড়ার পাঠ চুকিয়েছেন। মেজ নাসরিন (১৮) ক্লাস এইটের পর আর এগোতে পারেননি, আর ছোট তানিয়ার (১৬) স্কুলজীবন থেমে গিয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণিতেই। ঘরের কোনও কাজ করার ক্ষমতাটুকুও নেই তাঁদের। এমনকী রাতের অন্ধকারে যাতে পুকুরে ঝাঁপ দিতে না পারেন, সেই ভয়ে বারান্দায় গ্রিল বসিয়ে তালাবন্ধ করে রাখতে হয় তিনজনকে।
চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, এই অদ্ভুত শারীরিক সমস্যার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে বংশগত জটিলতায়। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তিন বোনের দাদু মুস্তাফা শেখ ও তাঁর দুই ছেলে উভয়েরই অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি এবং ডায়াবেটিসে অকালমৃত্যু হয়েছিল।
এ বিষয়ে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ অনাদি রায়চৌধুরী জানান, বাইরে থেকে বিষয়টি বংশগত মনে হলেও পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।
অন্য দিকে, বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রঞ্জন ভট্টাচার্যের মতে, অতিরিক্ত ওজনের কারণে সমাজের কটূক্তি থেকে জন্ম নেওয়া গভীর মানসিক অবসাদ বা 'সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার'-এর জেরেও এমন শারীরিক জ্বালা অনুভূত হতে পারে। তার উপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোংরা জলে ডুবে থাকার ফলে একজিমা, টিনিয়া কিংবা স্ক্যাবিসের মতো চর্মরোগও তাঁদের শরীরে বাসা বাঁধছে।
ইকবালের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ঝড় তোলায় তাঁর চিকিৎসার রাস্তা খুলেছে কিন্তু বেলডাঙার এই তিন বোনের দীর্ঘশ্বাস এখনও বন্দি ফরাজিপাড়ার বন্ধ গ্রিলের পিছনে। একাকী মা গুলশন বেওয়া এখন শুধুই চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন যদি কোনও সহৃদয় হাত কিংবা সরকারি সাহায্য এসে বাঁচায় তাঁর তিন মেয়েকে!