ঢাকা: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে পিস্তল হাতে সরাসরি মাঠে নামলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এক হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, অন্য হাতে মাইকের মুখ নিয়ে সন্দেহভাজন কয়েক জনকে ধাওয়া করার সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। শনিবার গেণ্ডারিয়া এলাকায় রেললাইনের পাশে একটি বস্তিতে এই অভিযান চালানো হয় বলে জানা গিয়েছে। পরে ওই অভিযানের ভিডিয়ো নিজের সমাজমাধ্যমের পাতায় প্রকাশ করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী। যদিও তা ঘিরে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর ভিডিয়োটি সরিয়ে নেওয়া হয় বলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের খবর।
ভিডিয়োয় দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই এক দল লোকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ইশরাক। তাঁর হাতে পিস্তল, সঙ্গে মাইকের মুখ। কয়েক জনকে লক্ষ্য করে তাঁকে চিৎকার করে থামতে বলতে শোনা যায়। ভিডিয়োর একটি অংশে পিস্তলের স্লাইড টেনে অস্ত্রটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করার মতো দৃশ্যও দেখা গিয়েছে। তাঁর সঙ্গে থাকা অন্তত এক জনের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে সংবাদমাধ্যমের খবর। প্রতিমন্ত্রীর সহযোগীরা কয়েক জনকে ধরে ফেলেন। পরে তাঁদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ইশরাকের সমাজমাধ্যমের পোস্টে অভিযানের উদ্দেশ্য হিসেবে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার ঢাকা-৬ সংসদীয় এলাকার গেণ্ডারিয়া থানার অধীন দয়াগঞ্জ রেলগেট সংলগ্ন এলাকায়। প্রতিমন্ত্রীর দাবি, ওই অঞ্চলে দীর্ঘ দিন ধরেই মাদক কেনাবেচা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল। মাদক কারবার বন্ধ করতে একাধিক বার পুলিশকে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সেই কারণেই নিজে অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তবে পুলিশের বক্তব্যে উঠে এসেছে অন্য দিক। গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর সহযোগীরা কয়েক জনকে আটক করে মাদকসেবী বলে দাবি করার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের থানায় নিয়ে আসে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কিছু গুঁড়ো পদার্থ পাওয়া গিয়েছে। সেগুলি মাদক কি না, তা পরীক্ষার পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ, আটক ব্যক্তিরা মাদক কারবারে যুক্ত কি না, তা এখনও প্রমাণিত নয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারি বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানার বক্তব্য, অভিযান চালানোর আগে প্রতিমন্ত্রী পুলিশকে জানাননি। পরে বিষয়টি জানতে পারে পুলিশ। তাঁর দাবি, ছয়-সাত জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। অন্য দিকে, ইশরাকের অভিযোগ, এলাকায় মাদক কারবার নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বহু বার আলোচনা করেও তিনি কার্যকর ফল পাননি। পুলিশ অবশ্য দাবি করেছে, ওই এলাকায় এর আগেও মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে, একজন প্রতিমন্ত্রীর পিস্তল হাতে সরাসরি অভিযানে নামা কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং আইনসম্মত। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও তা ব্যবহারের অধিকার সীমাহীন নয়। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে অস্ত্র বহন এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখিয়ে সন্দেহভাজনদের ধাওয়া করা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত নীতিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। জনসমক্ষে অস্ত্র এমন ভাবে প্রদর্শন করা, যাতে মানুষের মধ্যে ভয় বা আতঙ্ক তৈরি হয়, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে।
ভিডিয়োয় আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইশরাকের সঙ্গে থাকা এক নিরাপত্তারক্ষীকে এক ব্যক্তিকে লাথি মারতে দেখা গিয়েছে বলে বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের নির্দোষ বলেও দাবি করেছেন। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও, সন্দেহভাজনদের আটক করা, তাঁদের সঙ্গে আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে।
ইশরাক জানিয়েছেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকাকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান চালানো হবে। মাদক কারবারে যে দলের লোকই যুক্ত থাকুন না কেন, তাঁদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও বার্তা দিয়েছেন তিনি। এমনকি তাঁর নিজের দলের কেউ জড়িত থাকলে আরও কঠোর শাস্তির পক্ষে সওয়াল করেছেন প্রতিমন্ত্রী। মাদকাসক্তি তরুণ প্রজন্মের ক্ষতি করছে—এই যুক্তিতেই অভিযানের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
কিন্তু মাদকবিরোধী লড়াইয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও আইনের সীমারেখা মেনে চলা জরুরি। সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাঁদের আটক করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনকে সক্রিয় করার জন্য চাপ দিতে পারেন, স্থানীয় মানুষের অভিযোগ তুলে ধরতে পারেন, কিন্তু নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষত, যখন কোনও অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র প্রকাশ্যে ব্যবহারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।





