নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আবারও উত্তপ্ত। মতাদর্শের সংঘাত যেন ধীরে ধীরে এমন এক অন্ধ গলিতে প্রবেশ করেছে, যেখানে যুক্তির পরিবর্তে কথা বলছে মুষ্টি, বিতর্কের পরিবর্তে উড়ছে ইট-পাথর, আর রাজনৈতিক প্রতীকের লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আত্মপরিচয়। ১৯ অগস্ট রাত থেকে ২০ অগস্ট পর্যন্ত ABVP এবং SFI-সহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষ ঘিরে ক্যাম্পাসে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পতাকা ছেঁড়া ও পোড়ানোর অভিযোগ সামনে এসেছে।
এর মধ্যেই উঠেছে আরও গুরুতর অভিযোগ, সিপিএম-ঘনিষ্ঠ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের পতাকা পায়ে মাড়ানোর অভিযোগ। অন্যদিকে বাম শিবিরের তরফেও ABVP-র বিরুদ্ধে পতাকা ছিঁড়ে ফেলা ও পোড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ পতাকা এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠনের পরিচয়চিহ্ন নয়; যাদবপুরের সংঘাতে সেটিই যেন পরস্পরের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে পদদলিত করার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তেই স্পষ্ট হবে, কিন্তু দৃশ্যটির অন্তর্নিহিত বার্তা নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর।
সবচেয়ে করুণ, এই রাজনৈতিক সংঘাতের অভিঘাত গিয়ে পড়েছে যাদবপুরের নিজস্ব ঐতিহ্যের উপর। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নকশা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীক সংঘর্ষের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতীকের একটি অংশ মাটিতে পড়ে যায় এবং সেটি পদদলিত হওয়ার দৃশ্য সামনে এসেছে।
এখানেই প্রশ্নটি রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সভ্যতার প্রশ্নে পৌঁছয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় গড়ে উঠেছে মুক্তচিন্তা, তর্ক, প্রতিবাদ এবং বৌদ্ধিক স্বাধীনতার উপর, সেখানে রাজনৈতিক প্রতীককে পায়ের নীচে ফেলে দেওয়া কিংবা শিল্প-ঐতিহ্যের প্রতীককে ভেঙে দেওয়া দুই-ই একই অসহিষ্ণুতার ভিন্ন প্রকাশ। পতাকার রং আলাদা হতে পারে, মতাদর্শ আলাদা হতে পারে; কিন্তু শিক্ষাঙ্গনের মাটিতে কোনও পতাকাই অপমানের বস্তু হওয়া উচিত নয়।
এই আবহেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ABVP বিজেপির ছাত্র সংগঠন নয় এবং সংগঠনটির নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও সংগঠনের পতাকা পোড়ানো বিজেপির সংস্কৃতি নয়; একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিজেপি সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
কিন্তু রাজনীতির অভিধানে ‘সম্পর্ক নেই’ বললেই কি জনমানসে তৈরি হওয়া প্রশ্ন মুছে যায়? ABVP নিজেকে স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে এটি একটি সাংগঠনিক বাস্তবতা। কিন্তু তার রাজনৈতিক-আদর্শিক অবস্থান নিয়ে যে বৃহত্তর বিতর্ক রয়েছে, যাদবপুরের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ সেই বিতর্ককে ফের সামনে এনেছে। একইভাবে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির বিরুদ্ধেও ABVP-র উপর হামলা এবং ক্যাম্পাসে পেশিশক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। দুই পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে সত্য ক্রমশ রাজনৈতিক বয়ানের আড়ালে ঢাকা পড়ছে।
যাদবপুরে রাজনীতি নতুন নয়। এই ক্যাম্পাস বহু দশক ধরে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস দেখিয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদের সেই ঐতিহ্য কখনও ভাঙচুরের লাইসেন্স হতে পারে না। মতাদর্শের স্বাধীনতা যদি প্রতিপক্ষের প্রতীককে পায়ের নীচে নামিয়ে আনার স্বাধীনতায় পর্যবসিত হয়, তবে সেটি আর গণতন্ত্র থাকে না তা হয়ে ওঠে সংখ্যার, শক্তির এবং ক্রোধের প্রদর্শনী।
আজ যাদবপুরের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ABVP বনাম বাম নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর ক্যাম্পাস কি এখনও বিতর্কের জায়গা, নাকি প্রতীকের যুদ্ধক্ষেত্র?
নন্দলাল বসুর শিল্পকর্ম ভাঙা, রাজনৈতিক পতাকা পদদলিত করার অভিযোগ, আগুন, ইট-পাথর, আহত ছাত্র এই প্রতিটি ঘটনা একই সতর্কবার্তা বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা জ্ঞানের জন্য; প্রতিশোধের জন্য নয়। পতাকা মতের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু কোনও মতই মানুষের বিবেকের ঊর্ধ্বে নয়।
রাজনৈতিক সংগঠনগুলি আসবে, যাবে। পতাকার রং বদলাবে। নেতৃত্ব বদলাবে। কিন্তু যাদবপুরের ঐতিহ্য যেন আর একবার রাজনৈতিক উন্মত্ততার পায়ের নীচে না পড়ে এই দায় শুধু প্রশাসনের নয়, প্রতিটি ছাত্র সংগঠন এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরও।