নয়াদিল্লি: ছাত্র সংসদের নির্বাচন ফেরানোর দাবিতে আন্দোলন ঘিরে উত্তপ্ত দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘর্ষের আবহে আপাতত অনলাইনে ক্লাস করানোর সিদ্ধান্ত নিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শনিবার, ২৪ অক্টোবর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সমস্ত কোর্সের ক্লাস অনলাইনে হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত। অন্য দিকে, ছাত্র সংসদ পুনর্বহাল এবং নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিন ঘোষণার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অচলাবস্থা কাটার কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও নেই।
১২ অক্টোবর থেকে আন্দোলন, পাঁচ পড়ুয়ার অনশন
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা জেএমআইএসইউ পুনর্বহালের দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু করেছেন পড়ুয়াদের একাংশ। পাঁচ জন পড়ুয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন। তাঁদের মূল দাবি, ছাত্র সংসদ পুনর্বহালের পাশাপাশি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করতে হবে। শুধু ছাত্র সংসদের নির্বাচন নয়, আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ প্রক্টর ও নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে সরানোর দাবিও তুলেছেন।
তাঁদের বক্তব্য, ছাত্র সংসদ থাকলে পড়ুয়াদের সমস্যা ও দাবিদাওয়া জানানোর জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি কার্যকর মঞ্চ তৈরি হবে। জামিয়ায় শেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৬ সালে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরোধ হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তার পর থেকেই নির্বাচিত ছাত্র সংসদ আর চালু হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য, বিভিন্ন বিভাগ ও কেন্দ্রে ছাত্র প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সেই ব্যবস্থাকে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের বিকল্প বলে মানতে নারাজ।
সংঘর্ষের পর বন্ধ ক্যাম্পাসে ক্লাস
শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে পড়ুয়াদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সমস্ত কোর্সের ক্লাস অনলাইনে নেওয়া হবে। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধানদের অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এর আগে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘাতকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পড়ুয়াদের অভিযোগ, তাঁদের বিক্ষোভস্থল থেকে জোর করে সরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অনশনে থাকা কয়েক জন পড়ুয়ার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয় বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য, নির্ধারিত জায়গার বাইরে বিক্ষোভ চলায় শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছিল। নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘাতের ঘটনাতেও প্রশাসন নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। ফলে পড়ুয়া ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
আলোচনার জন্য কমিটি, তবু কাটেনি জট
আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়া খতিয়ে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির উদ্দেশ্য, পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, ছাত্র সংসদের নতুন সংবিধান তৈরির জন্যও পদক্ষেপ করা হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়টি পর্যালোচনার কথাও জানিয়েছে কমিটি। তবে ছাত্র সংসদের নির্বাচন কবে হবে, সেই প্রশ্নে এখনও নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়নি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, সংবিধান তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হলেও তাতে তাঁদের মূল দাবি পূরণ হচ্ছে না। নির্বাচনের দিন ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছেন তাঁরা। ফলে প্রশাসনের উদ্যোগ সত্ত্বেও অচলাবস্থা কাটেনি।
দুই সাংসদকে আটক ঘিরেও বিতর্ক
জামিয়ার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতরও বেড়েছে। পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে শুক্রবার কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদ এবং সমাজবাদী পার্টির সাংসদ মহিবুল্লাহ নদভিকে আটক করে দিল্লি পুলিশ বলে খবর। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের দেওয়ালে লেখা কয়েকটি স্লোগান ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই লেখাগুলির নিন্দা করে জানিয়েছে, কারা সেগুলি লিখেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
তবে এই ঘটনাগুলির সঙ্গে আন্দোলনকারীদের কারও যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।সব মিলিয়ে জামিয়ায় ছাত্র সংসদ পুনর্বহালের দাবি ঘিরে আন্দোলন এখন নতুন পর্যায়ে। এক দিকে পড়ুয়াদের অনশন ও নির্বাচনের দাবিতে অনড় অবস্থান, অন্য দিকে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনলাইনে ক্লাস চালানোর সিদ্ধান্ত—দুইয়ের মধ্যে আপাতত সমাধানের রাস্তা স্পষ্ট নয়। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত অনলাইনে ক্লাস চলবে। তবে ছাত্র সংসদের নির্বাচন নিয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না হলে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা কত দ্রুত কমবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।




