জম্মু: গবেষণার কাজ, প্রবন্ধ লেখা, ভূ-রাজনীতি নিয়ে আলোচনা—শুরুতে সবই ছিল চর্চার মতো। কিন্তু তদন্তকারীদের সন্দেহ, সেই পরিচয়ের আড়ালেই চলছিল অন্য খেলা। চিনের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যেরা নিজেদের শিক্ষাবিদ বা গবেষক পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করেছিলেন এক সেনাকর্তার স্ত্রীর সঙ্গে। প্রথমে পরিবেশ ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে লেখা তৈরির অনুরোধ, পরে ধীরে ধীরে আলোচনার বিষয় প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন তথ্য। জম্মুতে এক সেনাকর্তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ ও বিদেশি গোয়েন্দাদের কাছে পাঠানোর অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত মহিলা তেলঙ্গানার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি স্বামীর সঙ্গে জম্মুর গান্ধী নগর থানা এলাকার মধ্যে থাকেন। তাঁর স্বামী ভারতীয় সেনার এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক। অভিযোগ, কয়েক জন ব্যক্তি নিজেদের শিক্ষাবিদ পরিচয় দিয়ে অনলাইনে ওই মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ ও লেখা তৈরি করতে বলা হয়। প্রথম দিকে পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি চললেও পরে প্রতিরক্ষা এবং সামরিক কৌশল সংক্রান্ত বিষয়ের দিকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, এ ভাবেই ধাপে ধাপে আস্থা অর্জন করে মহিলার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, ওই মহিলার কাছে থাকা কিছু নথি, ছবি ও বৈদ্যুতিন তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলি বিদেশি যোগাযোগের কাছে পাঠানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তথ্য আদানপ্রদানে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। তবে ঠিক কী ধরনের নথি বা তথ্যের কথা বলা হচ্ছে, কারা সেগুলি চেয়েছিলেন এবং আদৌ কোনও তথ্য তাঁদের কাছে পৌঁছেছিল কি না, পুলিশ এখনও প্রকাশ্যে জানায়নি।
এই ঘটনায় জম্মুর গান্ধী নগর থানায় ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর এফআইআর দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মামলায় ১৯২৩ সালের সরকারি গোপনীয়তা আইন বা অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ নম্বর ধারা এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৫২ ও ৬১(২) নম্বর ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সরকারি গোপনীয়তা আইনের ৩ নম্বর ধারায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে, এমন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশের বিষয়টি বিবেচিত হয়। ৫ নম্বর ধারায় সুরক্ষিত তথ্যের বেআইনি আদানপ্রদান, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অপরাধের কথা রয়েছে।
পুলিশের কাছে আসা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই মহিলার কার্যকলাপ খতিয়ে দেখা শুরু হয় বলে জানা গিয়েছে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল কি না, থাকলে সেই যোগাযোগের প্রকৃতি কী, এবং কোনও সামরিক বা কৌশলগত তথ্য আদানপ্রদান হয়েছে কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। চিনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ছাড়াও অন্য কোনও বিদেশি সংস্থার যোগাযোগ ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে তদন্তকারীরা তাঁর গবেষণামূলক কাজের ধরন, যোগাযোগের সূত্র এবং কোনও তথ্য আদানপ্রদানের প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করছেন।
সেনাকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা নতুন নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। কারণ, সামরিক ঘাঁটি, সেনার গতিবিধি, প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা কিংবা কৌশলগত পরিকাঠামো সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্য না থাকলেও, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া ছোট ছোট তথ্য একত্র করে গুরুত্বপূর্ণ ছবি তৈরি করা সম্ভব। সেই কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তির গবেষণার অনুরোধ, অর্থের বিনিময়ে প্রবন্ধ লেখার প্রস্তাব কিংবা প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত প্রশ্নের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞেরা।
এই মামলায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যোগাযোগের সূত্র খুঁজে বের করা এবং অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ। কারা শিক্ষাবিদের পরিচয় নিয়েছিলেন, কী ভাবে তাঁরা মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, কী ধরনের লেখা বা তথ্য চাওয়া হয়েছিল এবং কোনও নথি সত্যিই বিদেশে পাঠানো হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললেই তদন্তের গতিপথ স্পষ্ট হবে। আপাতত চিন-যোগের অভিযোগ ঘিরে তদন্ত চলছে; কিন্তু তথ্য পাচার হয়েছিল কি না, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।





