বিশেষ প্রতিবেদন: বিশ্বাস, নাকি নিছক কুসংস্কার? মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ পেতে কোথাও কোথাও বলি দেওয়া হচ্ছে তাঁরই বাহন পেঁচাকে। সমৃদ্ধির আশায় যে পাখিকে ঘিরে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সেই পাখির জীবনই আজ বিপন্ন অন্ধবিশ্বাস ও অবৈধ বাণিজ্যের জেরে। উৎসবের মরশুমে বাড়ছে পেঁচা শিকার ও কেনাবেচার আশঙ্কা। প্রশ্ন উঠছে, দেবীর কৃপা লাভের আশায় তাঁরই প্রিয় বাহনকে হত্যা করে কি সত্যিই আশীর্বাদ পাওয়া সম্ভব?
দেবীর বাহন, তবু রেহাই নেই!
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে পেঁচা মা লক্ষ্মীর বাহন। অথচ কিছু মানুষের ধারণা, পেঁচাকে বলি দিলে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি আসে। এই ধরনের লোকবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই পেঁচা শিকার ও অবৈধ বাণিজ্যের কারবার সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও তন্ত্রসাধনার নামেও পেঁচা ও তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু সমৃদ্ধির সঙ্গে একটি নিরীহ প্রাণীর মৃত্যুর সম্পর্ক কোথায়? দেবীর বাহনকে হত্যা করে দেবীর আশীর্বাদ পাওয়ার এই ধারণা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে প্রাণীহত্যার মতো নিষ্ঠুরতা কোনওভাবেই কি সমর্থনযোগ্য?
ভারতে প্রায় ৩০ প্রজাতি, শিকার ও বাণিজ্যে উদ্বেগ
ভারতে প্রায় ৩০ প্রজাতির পেঁচা রয়েছে। WWF-এর তথ্য অনুযায়ী, এই প্রজাতিগুলির মধ্যে প্রায় অর্ধেকই শিকার ও অবৈধ বাণিজ্যজনিত সমস্যার মুখে পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান ইগল আউল, বার্ন আউল এবং স্পটেড আউলেটের মতো পেঁচাদের পাশাপাশি সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্রাউন ফিশ আউল ও ডাস্কি ইগল আউলের কথাও উঠে এসেছে।
প্রতি বছর ঠিক কত পেঁচা শিকার বা বলির নামে প্রাণ হারায়, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের আশঙ্কা, উৎসবের মরশুমে লোকবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে এই পাখি ধরার প্রবণতা এবং অবৈধ বাণিজ্যের তৎপরতা বাড়তে পারে। ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে নিশাচর এই পাখিদের অস্তিত্ব।
বাসস্থান হারিয়েও বিপন্ন পেঁচারা
শুধু চোরাশিকার বা বলি দেওয়ার কুসংস্কারই নয়, পেঁচাদের অস্তিত্বের জন্য আরও নানা সমস্যা রয়েছে। নির্বিচারে গাছ কাটা, নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনে ক্রমশ কমছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকও পেঁচাদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। কীটনাশকের প্রভাবে বিষাক্ত হয়ে ওঠা ইঁদুর শিকার করে খেলে পেঁচার শরীরেও ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করতে পারে। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পেঁচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে কৃষিক্ষেত্রেরও উপকার করে এই পাখি। মানুষের অন্ধবিশ্বাস ও পরিবেশের পরিবর্তন দুইয়ের চাপে তাই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে পেঁচাদের ভবিষ্যৎ।
দেবীর পুজোয় বার্তা হোক বাহনের প্রাণরক্ষার
১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন অনুযায়ী, পেঁচা শিকার, ধরা, কেনাবেচা ও পাচারের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন জনসচেতনতা, নিয়মিত নজরদারি এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদ। ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে।
এবারের দীপাবলিতে শুধু ঘর নয়, আলোকিত হোক আমাদের বিবেকও। মনে রাখতে হবে, দেবীর আশীর্বাদ পাওয়ার আশায় তাঁরই বাহনকে হত্যা করার মধ্যে কোনও পুণ্য নেই, রয়েছে শুধুই নিষ্ঠুরতা। প্রদীপের আলোয় উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র, আর মানুষের অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে মুক্তি পাক প্রকৃতি ও তার নিরীহ প্রাণীরা।
কোজাগরী পূর্ণিমা হোক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সহাবস্থান ও প্রাণরক্ষার বার্তা দেওয়ার উৎসব।




